আবু সাইদ শওকত আলী,বিশেষ প্রতিনিধি:
শিক্ষার আলো পৌঁছানোর কথা যেখানে, সেখানে অন্ধকার নামাচ্ছে নিষিদ্ধ গাইড বই। ঝিনাইদহের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখনো লেকচার, ব্যতিক্রম,
পাঞ্জেরী ও অ্যাডভান্সের মতো নিষিদ্ধ বইয়ে ভরসা করছে, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা আর প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের মাথা গুনে নিষিদ্ধ গাইড কোম্পানীর কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন ঝিনাইদহের স্কুল কলেজের প্রধানরা।
শিক্ষার্থী প্রতি তিন’শ থেকে পাঁচ’শ টাকায় নিষিদ্ধ গাইড কোম্পানীর কাছ থেকে চুক্তি করা হচ্ছে।
ফলে বাধ্য হয়ে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের লেকচার, ব্যাতিক্রম, পাঞ্জেরী ও অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে হচ্ছে।
অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলার ৬টি উপজেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সরকার
নিষিদ্ধ করা গাইড বা নোট বই। স্কুল-কলেজের
প্রধানদের সরাসরি যোগসাজসে ঝিনাইদহের আনাচে কানাচে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের বাজার এখন রমরমা।
ফলে লেকচার, ব্যাতিক্রম, পাঞ্জেরী ও অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের অবৈধ গাইড বইয়ের মজুদ গড়ে
উঠেছে ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর এলাকার উদয়ন লাইব্রেরী, পাগলাকানই ব্যতিক্রম ভবন ও উপশহর পাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে।
উদয়ন লাইব্রেরীর মালিক রাকিবুল ইসলাম রণি একাই ১২টি নিষিদ্ধ গাইড কোম্পানীর স্থানীয় এজেন্ট
হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ২০২৬ সালে শতাধীক কোচিং সেন্টারের কাছে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার
নিষিদ্ধ গাইড বই বিক্রি করার চুক্তি করেছেন বলে অভেযোগ। এছাড়া লেকচার পাবলিকেশনের মঞ্জুরুল ইসলাম, সম্রাট কুমার, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনের আলী হোসেন, সাদিক হোসেন ও অ্যাডভান্স
পাবলিকেশনের মিজানুর রহমান গাইড বিক্রির বিশষে মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
অভিযুক্ত উদয়ন লাইব্রেরীর মালিক রাকিবুল ইসলাম রণি বলেন, আমি কোন গাইড কোম্পানীর স্থানীয়
এজেন্ট হিসেবে কাজ করিনা। এমনকি কোন কোচিং সেন্টারের সাথে টাকার বিনিময়ে নিষিদ্ধ গাইড বই বিক্রি করার চুক্তি করিনি। আমাকে নিয়ে কেউ মিথ্যা
তথ্য দিচ্ছে যাতে কওে আমার ব্যবসায় কিছু ক্ষতি হয়। তবে আমি কোন কোম্পানীর সাথে কোন প্রকার লেনদেন করিনী।গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে
জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক চুক্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে আছে ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর
মুক্তিযোদ্ধা মশিউর রহমান বালিকা বিদ্যালয় ২ লাখ, শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৭০ হাজার, জামিলা খাতুন বালিকা বিদ্যালয় ৯০ হাজার,
হাটগোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩ লাখ ৭০ হাজার, গোয়ালপাড়া মোশারফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়
৯০ হাজার, আল-হেরা ইসলামিক ইনস্টিটিউট ১ লাখ ৩০ হাজার, শিকদার মতলবুর রহমান মাধ্যমিক
বিদ্যালয় ৯০ হাজার, উত্তর নারানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২ লাখ ৫০ হাজার, হলিধানী মাধ্যমিক
বিদ্যালয় ১ লাখ ৩০ হাজার, চোরকোল মাধ্যমিক বিদ্যালয় এক লাখ ৬০ হাজার, বাজার গোপালপুর
স্কুল এন্ড কলেজ ১ লাখ ৬০ হাজার, কে এম এইচ জিয়ানগর ১ লাখ ৪০ হাজার, বিষয়খালী শহীদ মোস্তফা স্কুল এন্ড কলেজ ২ লাখ টাকা,
এম কে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ৪০ হাজার, সুরাট বারেক আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৯০ হাজার,
আনোয়ার জাহিদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৮০ হাজার, ফজের আলী স্কুল এন্ড কলেজ ১ লাখ ৭০ হাজার,
ঝিনাইদহ পৌর মডেল স্কুল এন্ড কলেজ ১ লাখ ৩০ হাজার ও হরিশংকরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ ৪২১টি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ডোনেশন নিয়ে ২০২৬ সালে নিষিদ্ধ গাইড বই চালানোর চুক্তি করেছেন বলে অভিযোগ।
এদিকে কালীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন সারা উপজেলায় নিষিদ্ধ
গাইড বই চালানোর জন্য লেকচার গাইড কোম্পানীর কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ।কামরুজ্জামান ও হুসাইন নামে দুই
অভিভাবক অভিযোগ করেন, “বই না কিনলে ছেলে-মেয়েকে ক্লাসেই ঢুকতে দেওয়া হয় না। অভিভাবকরা
বলছেন, দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এ ধরনের চাপ সহ্য করা সম্ভব নয়”। অভিভাবক কামরুজ্জামান জানান,
তার ছেলে দশম শ্রেনীতে পড়ে। তার জন্য নিষিদ্ধ গাইড ও টেষ্ট পেপার কিনতে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান বিক্রয় নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের অবাধ বিক্রির বিষয়ে বলেন, এই বই বিক্রি করা সম্পুর্ন
অনৈতিক ও অবৈধ বানিজ্য। এই গাইড বিক্রি বন্ধে প্রশাসনিক অভিযান চালানো যেতে পারে। তিনি কারা
কারা এই নিষিদ্ধ বানিজ্যের সঙ্গে জড়িত তাদের তালিকা চান সাংবাদিকদের কাছে।এ ব্যাপারে শিক্ষা ও আইসিটির দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট
এ.বি.এম. খালিদ হোসেন সিদ্দিকী জানান, তথ্য প্রমান পেলে আমরা কাউকে ছাড় দেব না। তিনি এ বিষয়ে
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ জানিয়ে বলেন, নিষিদ্ধ গাইড বই শিক্ষার্থীদের মেধা ও
মননশীলতা বিকাশে অন্তরায়। ফলে ঝিনাইদহ জেলায় এই নিষিদ্ধ গাইড বই যাতে না চলে সে বিষয়ে দ্রতই ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।