জীবননগর অফিস:-
সেনা হেফাজতে মৃত্যুবরণকারী জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলু (৫২)-এর জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় জীবননগর পৌর ঈদগাহ মাঠে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সর্বস্তরের মানুষ ডাবলুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের জোর দাবি জানান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ডাবলুর ছোট ভাই বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তিনি দেশে ফিরে এলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে ডাবলুকে দাফন করা হবে।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি. এম. তারিক-উজ-জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার (দামুড়হুদা সার্কেল) মো. আনোয়ারুল কবীর।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিজিএমইএ সভাপতি এবং চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান বাবু, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিআইপি সাহিদুজ্জামান টরিক, চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর মারুফ সারোয়ার বাবু, সাধারণ সম্পাদক খন্দকার অহিদুল আলমসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন,আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই দেশে কোনো নাগরিক যেন এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। ডাবলুর মৃত্যুর সঠিক বিচার চাই এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,এই ঘটনায় আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গভীরভাবে মর্মাহত। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি. এম. তারিক-উজ-জামান বলেন,যে ঘটনা ঘটেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শোক জানানোর মতো ভাষাও আমাদের নেই। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে যা যা করা প্রয়োজন, তা করা হবে। তদন্তে যাঁরা জড়িত থাকবেন, কেউই ছাড় পাবেন না।
পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, গত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত হাফিজা ফার্মেসির সামনে থেকে ডাবলুকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে বিএনপির একটি কার্যালয়ের এক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তাঁকে গুরুতর অবস্থায় জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মকবুল হোসেন জানান,১২ জানুয়ারি রাত ১২টা ১৬ মিনিটে ডাবলুকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়।
চুয়াডাঙ্গা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জামাল আল-নাসের গণমাধ্যমকে বলেন,ডাবলুকে তুলে নেওয়ার সময় জেলা পুলিশের কোনো সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পর পুলিশ খবর পায় এবং সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।
ডাবলুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত থেকেই জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান। রাত ২টার দিকে জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরদিন মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে তিনি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ আবারও ঘটনাস্থলে আসেন এবং নেতা-কর্মীদের শান্ত করেন। পরে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম এবং জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বিচারের আশ্বাস দেন। এরপর বেলা দেড়টার দিকে ডাবলুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়।
ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ভাই শরিফুল ইসলাম কাজল জীবননগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে তা এখনো নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে ঘটনার তদন্তে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি. এম. তারিক-উজ-জামান।
ডাবলুর মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় এখনো শোক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সর্বস্তরের মানুষ দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।