সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র ও চোরাকারবারীদের  দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি চ্যালেঞ্জের মুখে জননিরাপত্তা

আবু সাইদ শওকত আলী,বিশেষ প্রতিনিধি:–

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহে চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তায় জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চক্রটি ভারত থেকে অস্ত্রের চালান আনছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

ভারত সীমান্তঘেঁষা উপজেলা মহেশপুরে একের পর এক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। সীমান্তের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বর্ডারের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে মাদকের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে।

(বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, মহেশপুরে ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীন ২০টি বিওপি এলাকার দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তে গত এক বছরে একাধিক অভিযানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

বিজিবির দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি বাঘাডাঙ্গা গ্রাম থেকে একটি দেশীয় পিস্তল ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পাঁচ মাস পর ৩ জুন সামন্তা গ্রামের ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকা থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। একই বছরের জুলাই মাসে পৃথক অভিযানে তিনটি দেশীয় ও তিনটি বিদেশি পিস্তলসহ ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

২০২৫ সালের আগস্টে বাঘাডাঙ্গা গ্রামের টুনু মিয়ার গোডাউনের পাশে খড়ের গাদা থেকে একটি দেশীয় পিস্তল ও এক রাউন্ড গুলি এবং সেপ্টেম্বরে একটি বিদেশি পিস্তল ও এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে গত এক বছরে পাঁচটি দেশীয় ও চারটি বিদেশি পিস্তলসহ মোট ২১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে।

অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় মাদক, স্বর্ণ, গরু ও অন্যান্য পণ্য চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনাও বেড়েছে। অনেক সময় ছোট ছোট মাদক ও সোনা আটকের পেছনে বড় বড় চালান পাচার করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও যৌথ বাহিনীর নজরদারি সত্ত্বেও অপরাধীরা নতুন কৌশলে অস্ত্র স্থানান্তর ও মজুত করছে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুর্বল আইনের ফাঁক গলিয়ে জামিনে বেরিয়ে অনেকেই পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শ্যামকুড় ইউনিয়নের বাসিন্দা রজব আলী বলেন, একসময় সীমান্ত এলাকায় অপরাধ করতে মানুষ ভয় পেত। এখন ধরা পড়লেও দ্রুত জামিন পেয়ে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মহেশপুর সীমান্তের বাঘাডাঙ্গা ও পলিয়ানপুর বিওপি এলাকায় ঝোড় পাড়া সংলগ্ন পথ অবৈধ অনুপ্রবেশের সক্রিয় রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রায়পুরের ৬০ নম্বর ব্রিজসংলগ্ন পথ দিয়ে চক্রের সদস্যদের যাতায়াতের তথ্যও পাওয়া গেছে।

এছাড়া লড়াইঘাট, হাড়িঘাটা ও পেপুলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে গরুসহ বিভিন্ন পশু পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

গত বছরের ২৭ জুন বাগেরহাটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ১১ যুবককে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে চারটি ৭.৬২ এমএম চাইনিজ পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড গুলি, ধারালো অস্ত্র ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত সকল আসামীই মহেশপুর উপজেলার বাসিন্দা এ জব্দকৃত সকল অস্ত্রই ভারত থেকে আনা হয়েছিল৷

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি সব সময়ই বড় ঝুঁকি। এসব অস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সহিংসতা উসকে দিতেও ব্যবহার হতে পারে। অস্ত্র প্রবেশ বন্ধে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, স্থানীয় সোর্স নেটওয়ার্ক ও আন্তঃবাহিনী সমন্বয় জোরদার করা জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন,সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের এই প্রবণতা কেবল স্থানীয় অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। সীমান্তজুড়ে কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *