বিশেষ প্রতিনিধি:-
চুয়াডাঙ্গার আলোচিত ও কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান লাল্টু (নান্টু) আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ইফতারের কিছুক্ষণ পর নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।
তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে চুয়াডাঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়িতে ভিড় করেন মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষ। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনায় থাকা এই ব্যক্তিত্বের জীবন ছিল ঘটনাবহুল ও বৈচিত্র্যময়।
নুরুজ্জামান লাল্টু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসারির একজন যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি সাহসী ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ এলাকার যুবকদের সংগঠিত করেন। পরবর্তীতে তিনি চরমপন্থি সংগঠন ‘বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’র সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সংগঠনটির এক প্রভাবশালী কমান্ডার হিসেবে পরিচিতি পান। সে সময় তার নাম ঘিরে নানা বিতর্ক ও আলোচনার সৃষ্টি হয়।
১৯৯৯ সালে সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রেক্ষাপটে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় প্রায় ১৯ বছর কারাভোগ করেন। ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ কারাবাস শেষে তিনি কারামুক্ত হন। ওইদিন চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়; অনেকেই তার প্রতিক্রিয়া জানার জন্য কারাগারের সামনে অপেক্ষা করেন। মুক্তির পর তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
কারামুক্তির পর তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামে নিজ এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার নামে একটি খেলার মাঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং স্থানীয় হাটবাজার প্রতিষ্ঠায়ও তার অবদান রয়েছে বলে এলাকাবাসী জানান। ফলে বিতর্কিত অতীত সত্ত্বেও এলাকায় তার জনপ্রিয়তা ছিল লক্ষণীয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা হারানোর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয় বলে জানা যায়। তবে গ্রেফতারের কয়েক দিন পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ইফতারের কিছুক্ষণ পর নিজ বাড়িতে অসুস্থতাজনিত কারণে তার মৃত্যু হয় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তার জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরিবার পরে ঘোষণা করবে বলে জানা যায়।
নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবন একদিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গৌরবের, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে বিতর্ক ও সহিংস রাজনীতির অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতায় তার নাম বহু বছর ধরে আলোচিত ছিল। তার মৃত্যুতে এক যুগের অবসান হলো বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।