শৈলকুপায় সড়ক নির্মাণে ‘মাটি কেলেঙ্কারি’: জমি কেটে নেওয়ায় ঝুঁকিতে শতাধিক পরিবার

আবু সাইদ শওকত আলী,বিশেষ প্রতিনিধি:-
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে নির্ধারিত উৎস থেকে মাটি সংগ্রহ না করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কেটে সেই মাটি সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সড়কের দু’পাশে বসবাসরত শতাধিক পরিবার চরম ভোগান্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাড়াগঞ্জ বাজার থেকে শৈলকুপা শহর পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন কাজ চলছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে পাশের জমি থেকে গভীর গর্ত করে মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। অনেক জায়গায় এসব গর্ত এতটাই গভীর যে সেগুলো এখন স্থানীয়দের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের অনুমতি ছাড়াই জোরপূর্বক জমিতে প্রবেশ করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। বাধা দিলেও প্রভাব খাটিয়ে কাজ চালিয়ে যায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে চলাচলের পথ এবং বেড়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। বিশেষ করে আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে ভূমিধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বারইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জরিনা খাতুন বলেন, “আমার একমাত্র জমিটাই শেষ করে দিয়েছে। বাড়িতে ঢোকা-বের হওয়াই কষ্টকর হয়ে গেছে। স্বামীর ভ্যান তুলতে এখন দুই-তিনজন লাগে।”একই গ্রামের আকলিমা খাতুন বলেন, “ঘরের পাশে বড় গর্ত করা হয়েছে। বৃষ্টিতে ঘর ভেঙে গর্তে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি।”

মাজেদা খাতুন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে। বৃষ্টি হলে গর্তে পানি জমবে, তখন বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।”একাধিক ভুক্তভোগী জানান, কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই তাদের জমি থেকে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। বরং প্রতিবাদ করলে হুমকি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল ঠিকাদার ঝিনাইদহের মিজানুর রহমান মাসুম। তার কাছ থেকে সাব-ঠিকাদারি নিয়ে কাজ করছেন শৈলকুপার বাইরপাড়া গ্রামের চুন্নু শেখ। প্রায় ৬ কিলোমিটার সড়কটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ২১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, যার মধ্যে সড়কের দু’ধারে মাটি ভরাট বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ২৫ লাখ টাকা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-ঠিকাদার চুন্নু শেখ দাবি করেন, “সমস্যার কথা কেউ আমাকে জানায়নি। অভিযোগ পেলে গর্ত ভরাট করে দেওয়া হবে।” তবে পরবর্তীতে তিনি প্রতিবেদককে অর্থ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে মূল ঠিকাদার মিজানুর রহমান মাসুম বলেন, “চুন্নু শেখ সাব-ঠিকাদারি নিয়েছেন। এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কিছু বলা কঠিন।”সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে মাটি কেটে সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নিয়ম লঙ্ঘন করে জমি কেটে মাটি নেওয়া স্পষ্ট দুর্নীতির অংশ। দ্রুত গর্ত ভরাট, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *