বৃহত্তর কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গার নতুন আশার নাম ‘পদ্মা ব্যারেজ’

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিনিধি:-

দীর্ঘদিন ধরে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে ধুঁকছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। একসময় খরস্রোতা গড়াই, মাথাভাঙ্গা, নবগঙ্গা কিংবা চন্দনার মতো নদীগুলো আজ শুষ্ক মৌসুমে হারিয়ে ফেলেছে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ। পানির অভাবে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ সংকট। লবণাক্ততার আগ্রাসন আর মরুকরণের হুমকিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ।

এই সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যেই সরকার হাতে নিয়েছে বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারেজ’ মেগা প্রকল্প। রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে নির্মিতব্য প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারেজকে এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার মানুষের “লাইফলাইন” হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি কমাতে এটি দুই ধাপে সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা

দেশের অন্যতম আধুনিক এই পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে থাকছে-২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজ। 

৭৮টি স্পিলওয়ে গেট,১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট,১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক,মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস,ব্যারেজের ওপর রেলওয়ে সংযোগ,১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম দুটি হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীতে পৃথক অফটেক অবকাঠামো

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি ব্যারেজ নয়; বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পানি ব্যবস্থাপনা বিপ্লব।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। ফলে গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া ও বড়াল-ইছামতী নদী ব্যবস্থায় আবারও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে।

এছাড়া সুন্দরবনে স্বাদু পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ ভূখণ্ড প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। বিশেষ করে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮.৮০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।

ফলে প্রতি বছর অতিরিক্ত—প্রায় ২৩.৯০ লাখ টন ধান উৎপাদন  এবং প্রায় ২.৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন। প্রকল্পটির অর্থনৈতিক মুনাফার হার ধরা হয়েছে ১৭.০৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন সম্ভব হবে।

বুয়েটের পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ মাশফিকুস সালেহীন বলেছেন, পদ্মা ব্যারেজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী পুনরুদ্ধার ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উজানে নদীভাঙন, ভাটিতে পলি জমা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে।

পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন,“পদ্মা ব্যারেজ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদী ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।”প্রথম পর্যায়ে ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকার পাবে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- কুষ্টিয়া,চুয়াডাঙ্গা,যশোর,সাতক্ষীরা,রাজবাড়ী,ফরিদপুর,পাবনা,রাজশাহী,পিরোজপুর।

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত পদ্মা ব্যারেজ এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন, নদীর পুনর্জাগরণের প্রতিশ্রুতি এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাহসী পদক্ষেপ। সফল বাস্তবায়ন হলে এই প্রকল্প বদলে দিতে পারে কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গাসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *