এক পা-তেই জীবনযুদ্ধ তবু হার মানেননি গোপী বিশ্বাস

প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন অভিশাপ: দুই সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্নই বেঁচে থাকার শক্তি

নড়াইল প্রতিনিধি:

একটি পা জন্ম থেকেই অচল। লাঠির ভরসায় প্রতিটি পদক্ষেপ। তবুও থেমে থাকেননি তিনি। জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই বেঁচে আছেন নড়াইলের গোপী বিশ্বাস (৩২)। এক পায়ে ভর করে সংসারের হাল টানছেন, আর বুকভরা স্বপ্ন দেখছেন—তার দুই সন্তান যেন বাবার মতো কষ্টের জীবন না পায়।

নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের কাজলা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত পানতিতা গ্রামের বাসিন্দা গোপী বিশ্বাস। বাবা নিতাই বিশ্বাস ও মা কল্পনা বিশ্বাসের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। জন্ম থেকেই একটি পা অচল। দারিদ্র্যের কারণে তৃতীয় শ্রেণির পরই বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি। ছোটবেলা থেকেই কাজ শিখে পরিবারের হাল ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।

স্থানীয় একটি দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে টর্চ লাইট, গ্যাস লাইটসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য মেরামতের কাজ রপ্ত করেন। প্রায় ১৯ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তবে সামান্য আয়ে সংসার না চলায় কখনো ভ্যান চালিয়েছেন, কখনো চা বিক্রি করেছেন, আবার কখনো ওয়েল্ডিংয়ের কাজও করেছেন। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো কাজই দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যেতে পারেননি।

শেষ পর্যন্ত আবার ফিরে এসেছেন নিজের পরিচিত পেশায়। জেলা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে মুলিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে, মুলিয়া-বাহিরগ্রাম সড়কের ধারে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটি খোলা দোকানই এখন তার কর্মস্থল। চারপাশে কোনো বেড়া নেই। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টর্চ লাইট, গ্যাস লাইট, এলইডি বাল্ব, স্প্রে মেশিন, রাইস কুকারসহ নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি মেরামত করেন তিনি।

গোপীর চার সদস্যের সংসার। স্ত্রী, এক কন্যা ও এক শিশুপুত্রকে নিয়েই তার ছোট্ট পরিবার। বড় মেয়ে বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। প্রতিদিন কাজ করে তার আয় হয় মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। কোনো দিন ভালো কাজ মিললে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আসে। কিন্তু বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই সামান্য আয়ে সংসারের চাকা ঘোরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কাজের সন্ধানে অনেক সময় ব্যাগভর্তি যন্ত্রপাতি নিয়ে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে পাশের তুলারামপুর হাটেও যেতে হয় তাকে। কষ্ট যেন তার জীবনের নিত্যসঙ্গী।

চোখে জল নিয়ে গোপী বিশ্বাস বলেন,“আজ একটু হলুদ কিনি, কাল একটু লবণ। ছেলেমেয়েকে নিয়মিত মাছ-মাংস খাওয়াতে পারি না। বাজার করতে গেলে দেনা করতে হয়। তিন মাস পর যে প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা পাই, সেটাও আগের ধার শোধ করতেই শেষ হয়ে যায়।”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি আরও বলেন,“প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন অভিশাপ। সংসার চালাব, নাকি ছেলেমেয়েকে মানুষ করব—এই চিন্তাতেই দিন কাটে। সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, আমাদের মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। আমার সন্তানরা যেন লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। ওদের মুখের হাসিই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

গোপীর দক্ষতার কথা জানালেন স্থানীয়রাও। তারা বলেন, তার মতো অভিজ্ঞ মেরামতকারীর ওপর এলাকার অনেক মানুষ নির্ভরশীল। তিনি না থাকলে ছোটখাটো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য জেলা শহরে যেতে হতো, এতে সময় ও অর্থ—দুটিই বেশি ব্যয় হতো।

লাইট মেরামত করতে আসা মিলন সরকার বলেন,“গোপীর কাজের মান খুব ভালো। তাই আমরা নির্ভয়ে তার কাছে জিনিসপত্র মেরামত করি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একা বসে পরিশ্রম করে সংসার চালায়। তার কষ্ট দেখলে সত্যিই খারাপ লাগে।”

কোড়গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ রায় বলেন,“গোপী অনেক বছর ধরে এই বাজারে কাজ করছে। সে সৎ, পরিশ্রমী ও দক্ষ মানুষ। সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তার পরিবারটা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।”

মুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন,“গোপী বিশ্বাস একজন প্রতিবন্ধী হয়েও কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি। নিজের শ্রম ও সততা দিয়ে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এই সংগ্রামী জীবন সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি ইতোমধ্যে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও সাধ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করা হবে।”

এক পা অচল, কিন্তু থেমে নেই জীবনের লড়াই। প্রতিদিন লাঠিতে ভর দিয়ে দোকানে এসে অন্যের নষ্ট যন্ত্রে নতুন প্রাণ ফেরান গোপী বিশ্বাস। অথচ নিজের জীবনটাই যেন মেরামতের অপেক্ষায়। সমাজের বিত্তবান মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিংবা সরকারি সহায়তার একটি হাত হয়তো বদলে দিতে পারে এই সংগ্রামী মানুষের জীবন, ফিরিয়ে দিতে পারে তার পরিবারের মুখের হারিয়ে যাওয়া হাসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *