বিশেষ প্রতিনিধি:-
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকি শেষ হয়ে গেলে তেলের দাম দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিল–এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বাড়া বড় কোনো বিষয় নয়। তার ভাষায়, “বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এটি খুবই ছোট একটি মূল্য।” তিনি আরও বলেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করা গেলে তেলের দাম খুব দ্রুত কমে আসবে।
ট্রাম্পের মতে, বর্তমানে যে মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে তা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতজনিত অস্থিরতার ফল। তার দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাজারও দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়।
এই পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের দামে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ১৮ দশমিক ৩৫ ডলার বা প্রায় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ০৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫ দশমিক ২৭ ডলার বা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ১৭ ডলারে। সেশনের শুরুতে এটি ২০ দশমিক ৩৪ ডলার বা প্রায় ২২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১১১ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছিল।
গত সপ্তাহজুড়েও বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ওই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২৭ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সংঘাতের ফলে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধিই মূলত তেলের বাজারে এই অস্থিরতার কারণ। এতে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে উচ্চমূল্যের জ্বালানির চাপ সহ্য করতে হতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব লোহিত সাগর অঞ্চলের বন্দরগুলো থেকে তেলের চালান বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে শিপিং তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহ কমে গেলে তার পুরো ঘাটতি পূরণ করা সহজ হবে না।
এএনজেড ব্যাংকের সিনিয়র পণ্য কৌশলবিদ ড্যানিয়েল হাইন্স বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক উৎপাদক বর্তমানে গুদামে তেল জমে যাওয়ার কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। যদি সংঘাত আরও তীব্র হয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে তেলের কূপ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়, তাহলে শুধু উৎপাদনই কমবে না—সংঘাত শেষ হওয়ার পরও সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বেশ সময় লাগতে পারে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী দিনে তেলের বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সূত্র: দ্য হিল