ঢালাই চলাকালীন ধসে পড়ল ব্রিজের অংশ ঝিনাইদহে এনডিআর প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ, তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি

আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ:

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হরিশংকরপুর ইউনিয়নের চন্দ্রাজানি ক্যানালের একটি ব্রিজে ঢালাই চলাকালীন শাটারিং ধসে ব্রিজের একটি অংশ ভেঙে পড়েছে| বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে| স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও অনিয়মের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে| তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকল্পের কাজের মান যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন|

জানা গেছে, ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এনডিআর (ঘউজ) প্রকল্পের অধীনে ব্রিজ রিপিয়ারিং ও টিপিয়া রিং নির্মাণের ২৪টি প্যাকেজ অনুমোদন করা হয়| প্রতিটি প্যাকেজের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা| চলতি জুন মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাসের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে কাজ করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে|

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২৪টি প্যাকেজের মধ্যে চারটি প্যাকেজের কাজ পায় ঝিনাইদহের এস এম এন্টারপ্রাইজ, যার ¯^ত্বাধিকারী সাবেক জেলা ছাত্রদল সভাপতি এস এম সোমেনুজ্জামান (সোমেন)| প্রায় ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ˆশলকূপা উপজেলার নিত্যানন্দনপুর ইউনিয়নের দুটি এবং ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হরিশংকরপুর ইউনিয়নের চন্দ্রাজানি ও সিতারামপুর এলাকায় দুটি ব্রিজের সংস্কার ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে|

স্থানীয়দের অভিযোগ, ˆশলকূপার নিত্যানন্দনপুর ইউনিয়নের দুটি প্রকল্পেই নিম্নমানের ইট, বালু ও খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে| তারা একাধিকবার কাজে আপত্তি জানালেও তা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হয়| তাদের দাবি, পুরনো ব্রিজের বিমে যেখানে ৯টি রড ব্যবহার করা হয়েছিল, সেখানে নতুন কাজে মাত্র ৪টি রড ব্যবহার করা হয়েছে| এছাড়া পুরনো ব্রিজ ভেঙে পাওয়া ইটের খোয়াও ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে|

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে চন্দ্রাজানি ক্যানালের ব্রিজে ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়| কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ নিচের শাটারিং সরে গিয়ে ব্রিজের একটি অংশ ধসে পড়ে| এ সময় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন|

স্থানীয়দের ভাষ্য, চন্দ্রাজানি ক্যানালের এই ব্রিজটি এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম| প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার মানুষ এ সেতু ব্যবহার করেন| সিতারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থীও এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে| এছাড়া কয়েকশ একর কৃষিজমির উৎপাদিত ফসল পরিবহনেরও প্রধান ভরসা এই ব্রিজ|

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলেন,“দুই মাস ধরে কাজ চলছে| শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি| আজ ঢালাইয়ের সময় ব্রিজের অংশ ভেঙে পড়ায় আমাদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হয়েছে| আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি চাই|”

সেলিম আহম্মেদ বলেন,“সরকার উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে| কিন্তু ঠিকাদারের গাফিলতি ও অনিয়মের কারণে মানুষ সেই সুফল পাচ্ছে না| নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ফলেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা মনে করি|”

রব্বানী মোল্লা বলেন,“এটি হাজারো মানুষের চলাচলের একমাত্র পথ| ঢালাইয়ের দিনই ব্রিজের অংশ ভেঙে পড়া নির্মাণকাজের মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে| ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত|”

মনিরুল ইসলাম বলেন,“আমরা বারবার কাজের ত্রুটির বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি| কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি| এখন দুর্ঘটনার পর সবাই বিষয়টি উপলব্ধি করছে|”

মতিয়ার রহমান বলেন,“এ ধরনের নিম্নমানের কাজ মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ| জনগণের অর্থের অপচয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে|”

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এম এন্টারপ্রাইজ-এর ¯^ত্বাধিকারী ও সাবেক ঝিনাইদহ জেলা ছাত্রদল সভাপতি এস এম সোমেনুজ্জামান (সোমেন)-এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি| ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি|

অন্যদিকে, ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমারের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, “এ কাজ আমাদের নয়|” তবে পরে বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এনডিআর প্রকল্পের আওতায় ব্রিজ রিপিয়ারিং ও টিপিয়া রিং নির্মাণের কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনেই বাস্তবায়িত হচ্ছে|

ঘটনার পর এলাকাবাসী প্রকল্পের সব কাজের গুণগত মান যাচাই, একটি ¯^াধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন| তাদের অভিযোগ, কাজ দ্রুত শেষ করার চাপ, তদারকির ঘাটতি এবং দুর্নীতির কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে| এ ঘটনায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে|

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *