গৌরীপুর প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলার যুবক ইয়াসিন শেখের স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া। দেশে সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায়, জীবিকার তাগিদে তিনি রাশিয়ায় পাড়ি জমান। প্রথমে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি নিলেও পরে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। গত ২৭ মার্চ ইউক্রেনের মিসাইল হামলায় তার সেই স্বপ্নের যাত্রা চিরতরে থেমে যায়।
পরিবারের শোক আর মরদেহ ফেরানোর আকুতি
ইয়াসিনের মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে পৌঁছায় ঈদুল ফিতরের পরদিন, এক সহযোদ্ধার মাধ্যমে। খবরটি শোনার পর থেকেই শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। মা ফিরোজা খাতুন ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছেন, বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। বড় ভাই রুহুল আমিন শেখ ছোট ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা। পরিবারের একমাত্র দাবি, যেন ইয়াসিনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
রাশিয়া যাওয়ার পেছনের গল্প
ডৌহাখলা গ্রামের মৃত আব্দুস সাত্তার শেখের ছোট ছেলে ইয়াসিন শেখ (২৫) চার ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন কনিষ্ঠ। দরিদ্র পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে ভালো বেতনের চাকরির আশায় গত বছরের জানুয়ারিতে রাশিয়ার একটি কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করেন তিনি।
সেপ্টেম্বরে চাকরির অফার লেটার পেয়ে রাশিয়ার মস্কো থেকে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দূরে কর্মস্থলে যোগ দেন। তিন মাস পর রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে নাম লেখান তিনি।
ফেসবুকেই জানিয়ে ছিলেন নিজের সিদ্ধান্ত
রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেয়ার ছবি ও ভিডিও নিয়মিত নিজের ফেসবুক পেজে আপলোড করতেন ইয়াসিন। বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে জানিয়ে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে না পারলেও বিদেশে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পেরেছি। এতে আমার কোনো আফসোস নেই।’ মাত্র এক মাস পরই সেই স্বপ্নের করুণ পরিণতি হয়।
মরদেহ ফেরানোর অনিশ্চয়তা
ইয়াসিনের পরিবারের সদস্যরা জানান, তার মরদেহের কী অবস্থা, সেটি দেশে ফেরানো সম্ভব কি না—এসব বিষয়ে কোনো তথ্য তারা পাচ্ছেন না। মরদেহ দেশে আনতে সরকারের সহায়তা চেয়েছেন তারা। এ বিষয়ে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদুল হাসান বলেন, ‘ইতোমধ্যে এসিল্যান্ডকে নিহতের বাড়িতে পাঠিয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
একটি স্বপ্নের করুণ পরিণতি
ঢাকার পল্লবীর সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের ডিগ্রি শিক্ষার্থী ছিলেন ইয়াসিন শেখ। স্বপ্ন দেখতেন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার, কিন্তু বাস্তবতা তাকে ঠেলে দেয় এক অনিশ্চিত যুদ্ধে। ইউক্রেনের মিসাইল হামলায় প্রাণ হারিয়ে তিনি ফিরে এলেন শুধুই একটি শোকগাঁথা হয়ে।
এখন তার পরিবার শুধু একটাই দাবি জানাচ্ছে—মরদেহ যেন দেশে ফেরানো হয়, যাতে তাকে শেষবারের মতো দেখতে পারে তার মা ও স্বজনেরা।