কুষ্টিয়া চিনিকলের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে মিলল নারীর অর্ধগ’লিত লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
​কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী জগতি সুগার মিলের (কুষ্টিয়া চিনিকল) একটি পরিত্যক্ত ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা আবাসিক কোয়ার্টার থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর (আনুমানিক বয়স ৩০-৩৫ বছর) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ বুধবার (৬ মে) দুপুরে মরদেহটি উদ্ধারের পর থেকেই গোটা এলাকায় নেমে এসেছে স্তব্ধতা ও তীব্র আতঙ্ক। স্থানীয় বাসিন্দা এবং চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কে এই নারী? আর কীভাবে এই সুরক্ষিত এলাকার পরিত্যক্ত কোয়ার্টার হয়ে উঠল অপরাধীদের কসাইখানা?

​প্রাথমিক আলামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে স্থানীয়দের জোরালো ধারণা, ওই নারীকে পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে গেছে দুর্বৃত্তরা।

​বুধবার দুপুরটা আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু দুপুরের দিকে এক স্থানীয় নারী কোয়ার্টারের পাশে ঘাস কাটতে গেলে পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়। ঘাস কাটার একপর্যায়ে পরিত্যক্ত ওই কোয়ার্টার ভবনের ভেতর থেকে বাতাসে ভেসে আসা তীব্র দুর্গন্ধ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কৌতুহলবশত ভবনের ভাঙা দরজা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিতেই ভয়ে হাড় হিম হয়ে যায় তার। ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন এক নারীর নিথর, অর্ধগলিত দেহ।
​তার চিৎকারে ছুটে আসেন আশেপাশের মানুষ। খবর দেওয়া হয় সুগার মিলের নিরাপত্তা প্রহরীকে। পরবর্তীতে মিল কর্তৃপক্ষ কালবিলম্ব না করে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশকে বিষয়টি জানালে, পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থল কর্ডন (ঘেরাও) করে ফেলে।
​অপরাধীদের অভয়ারণ্য ‘পরিত্যক্ত কোয়ার্টার’: ফুসলে এনে ধর্ষণের পর হত্যার আশঙ্কা
​দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়া চিনিকলের এই বিশাল আবাসিক এলাকাটি দেখভালের অভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চারপাশ ঝোপঝাড়ে ছেয়ে যাওয়ায় এটি মূলত সমাজবিরোধী ও অপরাধচক্রের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী জানান:​”এই পুরো এলাকাটা নির্জন এবং দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, অন্য কোনো এলাকার অপরাধী চক্র এই নারীকে ফুসলিয়ে কিংবা জোরপূর্বক তুলে এনে এখানে জিম্মি করেছিল। এরপর তার ওপর পাশবিক নির্যাতন বা দলবদ্ধ ধর্ষণ চালানো হয়। ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও নিজের পরিচয় আড়াল করতে ঘাতকরা তাকে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে পালিয়ে গেছে। আমরা এই পাশবিকতার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত নরপশুদের ফাঁসি চাই।”
​পুলিশের তৎপরতা: রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছে সিআইডি ক্রাইম সিন খবর পেয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। মরদেহটি এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে, খালি চোখে তাৎক্ষণিক পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় নির্ধারণের জন্য লাশটি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
​ঘটনার স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে অপরাধীদের অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে ডাকানো হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিটকে। প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

​কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান:“আমরা খবর পাওয়ার পরপরই দুপুরের দিকে ঘটনাস্থল থেকে লাশটি উদ্ধার করি। নিহতের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিচয় শনাক্তে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটকে তলব করা হয়েছে। স্থানীয়রা যে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা করছেন, তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার আগে মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। খুনি যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছে।”​এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর পুরো জগতি সুগার মিল এলাকা ও কুষ্টিয়া শহরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকাবাসী অরক্ষিত কোয়ার্টারগুলোতে পুলিশি টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো নিয়মিত মামলা দায়ের হয়নি; তবে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে এটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *