মহেশপুরে জনবল সংকটে থমকে মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক, সেবা থেকে বঞ্চিত প্রান্তিক খামারিরা

শহিদুল ইসলামমহেশপুর (ঝিনাইদহ):
প্রান্তিক খামারিদের দোরগোড়ায় আধুনিক প্রাণিসম্পদ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকারের নেওয়া ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক (এমভিসি) ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় কার্যত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসমৃদ্ধ গাড়িটি সচল থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া, জনবল সংকট, জ্বালানি ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো খামারি কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)-এর আওতায় মহেশপুর উপজেলায় এই মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে গবাদিপশুর রোগ নির্ণয়, প্রাথমিক চিকিৎসা, কৃত্রিম প্রজনন, টিকাদান, খামার ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলার অধিকাংশ খামারি প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করায় অসুস্থ গবাদিপশু উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে নিয়ে আসা তাদের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় মোবাইল ক্লিনিকটি নিয়মিত চালু থাকলে খামারিরা নিজ এলাকায় থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহেশপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে. এম. আসাদুজ্জামান জানান, সম্প্রতি তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নাটিমা ইউনিয়নে একদিন পরীক্ষামূলকভাবে মোবাইল ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো সব ইউনিয়নে নিয়মিতভাবে এ সেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, অনেকেই মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিককে পৃথক প্রকল্প হিসেবে মনে করলেও এটি মূলত এলডিডিপির আওতায় প্রাপ্ত একটি বিশেষ সুবিধা। ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গাড়ি পরিচালনা, জ্বালানি ব্যয় এবং জনবল ব্যবস্থাপনায় বাস্তব কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি আরও জানান, ক্লিনিকটির To&E (Transfer of Ownership and Equipment) প্রক্রিয়া সম্পন্নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি শেষ হলে জ্বালানি ব্যয় ও জনবল ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার সমাধান হবে এবং সেবাটি আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে ১১টি পদ থাকলেও বর্তমানে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন, উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (কৃত্রিম প্রজনন) এবং ড্রেসার—এই চারটি পদে জনবল কর্মরত রয়েছে। বাকি পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় বিস্তৃত পরিসরে মাঠপর্যায়ে সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় খামারিদের ভাষ্য, গবাদিপশু অসুস্থ হলে অনেক দূর থেকে উপজেলা কার্যালয়ে নিয়ে যেতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক নিয়মিত চালু থাকলে তারা বাড়ির কাছেই আধুনিক চিকিৎসাসেবা পেতেন, যা খামার ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ ও লাভজনক করে তুলত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এ গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি যেন বন্ধ বা স্থবির না হয়ে পড়ে, সে জন্য স্থায়ী বাজেট বরাদ্দ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা গেলে মহেশপুরের হাজারো প্রান্তিক খামারি সরাসরি উপকৃত হবেন এবং উপজেলার প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। বর্তমানে গাড়িটি সচল রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে খুব শিগগিরই প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিরা নিয়মিতভাবে এই সেবার আওতায় আসতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *