চুয়াডাঙ্গায় খাল পুন:খনন শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত গেল প্রায় ২০ লাখ টাকা

৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৫ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় ৩১ লাখ ৮২ হাজার ১ টাকা; উদ্বৃত্ত ১৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৯৪ টাকা ফেরত
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার, ব্যয়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্র। সদর উপজেলার মাখালডাঙ্গা বড় বিল থেকে চিত্রা নদী পর্যন্ত খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত দৈর্ঘ্য ও মান বজায় রেখে সম্পন্ন করার পর অব্যয়িত ১৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৯৪ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন তিনি।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৯ নম্বর মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের মাখালডাঙ্গা বড় বিল থেকে চিত্রা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত খালটির পানিপ্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্ত ছিল। ফলে বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষকদের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হতো। এতে স্থানীয় কৃষি উৎপাদন ও কৃষকদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল।
দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মাখালডাঙ্গা বড় বিল থেকে চিত্রা নদী পর্যন্ত ০.৮০০ কিলোমিটার বা ৮০০ মিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে মোট ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় নির্ধারিত ৮০০ মিটার খাল পুনঃখননের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের দাবি, প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় নির্ধারিত দৈর্ঘ্য, কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুরো বরাদ্দের অর্থ ব্যয় হয়নি। খাল পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন করতে মোট ব্যয় হয়েছে ৩১ লাখ ৮২ হাজার ১ টাকা। ফলে বরাদ্দের মধ্যে ১৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৯৪ টাকা অব্যয়িত থেকে যায়।
অব্যয়িত এই অর্থ অন্য কোনো খাতে স্থানান্তর বা ব্যয় না করে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র। গত ২৬ জুলাই ওই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খালটি পুনঃখননের ফলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি কৃষিজমিতে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এতে মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি কমবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে খালের পানিপ্রবাহ সচল থাকলে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, সরকারি অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার এই উদ্যোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্র বলেন, “খাল পুনঃখননের কাজ নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে। কাজের গুণগত মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আমি নিজে তদারকি করেছি। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর হিসাব অনুযায়ী ১৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৯৪ টাকা অব্যয়িত ছিল। সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অব্যয়িত অর্থ যথাযথ প্রক্রিয়ায় গত ২৬ জুলাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।”
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাখালডাঙ্গা বড় বিল থেকে চিত্রা নদী পর্যন্ত খালটির পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ায় এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও পরিবেশ—উভয় ক্ষেত্রেই পড়বে। তবে খালটির পুনরায় দখল, ময়লা-আবর্জনা ফেলা বা পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হলে প্রকল্পের সুফল আরও টেকসই হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একদিকে স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকট নিরসনে খাল পুনঃখনন, অন্যদিকে প্রকল্পের কাজ শেষ করে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত—দুটি বিষয়ই স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করে অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার এই উদ্যোগ সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীলতার একটি উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *