ঠিকাদারের গাফিলতিতে দুর্ভোগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষ, বিশ্বব্যাংকের অসন্তোষ
আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনার লক্ষ্যে নেওয়া ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক (এন-৭) ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প যেন এখন কচ্ছপগতির প্রতীক| প্রকল্প অনুমোদনের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ২ শতাংশ| জেলা প্রশাসন জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, সমš^য়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতায় থমকে আছে নির্মাণকাজ| ফলে প্রতিদিনই ভাঙাচোরা সড়ক, গর্ত ও ইটের সলিংয়ের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষ|
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঝিনাইদহ সদর এলাকায় প্রায় ৫০ শতাংশ এবং কালীগঞ্জ এলাকায় ৪৫ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে| প্রশাসনের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিশোধ করা হচ্ছে এবং অধিগ্রহণ কার্যক্রমও দ্রুত এগিয়ে চলছে| কিন্তু জমি হাতে পাওয়ার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই|
প্রকল্পের ধীরগতির জন্য শুরুতে জমি অধিগ্রহণের জটিলতাকে দায়ী করা হলেও এখন অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড এবং লট-১-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাক্স| অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠান দুটি পরিকল্পনামাফিক কাজ এগিয়ে নেয়নি|
জানা গেছে, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরকারের ছয়টি বিভাগের সমš^য়হীনতার কারণে শুরুতে কিছুটা বিল¤^ হয়েছিল| তবে বর্তমানে সেই জট অনেকটাই কেটে গেছে| জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুতগতিতে জমির ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং অধিগ্রহণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে|
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজ¯^) সুবীর কুমার দাশ বলেন, “আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে| আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের গাফিলতি নেই| দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রকল্পটি এ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে|”
লট-১-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নিলন আলী বলেন, “আগে জমি অধিগ্রহণের ধীরগতির কারণে সময়মতো কাজ শুরু করা যায়নি| মার্চ ও জুলাই মাসে বেশ কিছু জমি বুঝে পেয়েছি| বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে| আগামী সপ্তাহ থেকে মাঠে দৃশ্যমানভাবে কাজের গতি বাড়বে|”
তবে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন লট-২ ও ৩-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন| তিনি বলেন, “চলতি বছরের ডিসে¤^রের মধ্যে কোনোভাবেই কাজ শেষ করা সম্ভব নয়| জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে জমি পাওয়ার পরও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে এখন পর্যন্ত মাত্র ২ শতাংশ কাজ হয়েছে| কাজের গতি বাড়াতে একাধিকবার চিঠি ও তাগিদ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি|”
এদিকে নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক এখন দুর্ভোগের আরেক নাম| দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষ ভোমরা, বেনাপোল ও মোংলা বন্দরের পণ্যবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে দূরপাল্লার বাস, অ্যা¤^ুলেন্স ও সাধারণ যানবাহন প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে| মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত, ভাঙাচোরা অংশ ও ইটের সলিংয়ের কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে| বিশেষ করে ভোমরা, বেনাপোল, মংলা বন্দরের মালামাল উত্তরবঙ্গসহ দেশের নানা প্রান্তে পৌছানোর এক মাত্র সড়ক পথ ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক|
ভুক্তভোগী নয়ন হোসেন বলেন, “জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পরও ঠিকাদারের অবহেলায় পুরো মহাসড়ক এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে| প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে| বিষয়খালী বটতলা থেকে বাজার পর্যন্ত, তেঁতুলতলা, চুটলিয়া, দোকানঘর ও কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কের অবস্থা ভয়াবহ|”
ইজিবাইক চালক বাবলু মণ্ডল বলেন, “প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়| গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হয়|”
সরকারি কেসি কলেজের শিক্ষার্থী কেয়া খাতুন বলেন, “কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই অনেক সময় লেগে যায়| ধুলাবালি ও ভাঙা রাস্তার কারণে নিয়মিত কলেজে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে|”
ব্যাংকার রিন্টু মিয়া বলেন, “এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করি| দীর্ঘ যানজট ও ভাঙা রাস্তার কারণে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে|”
ট্রাকচালক লাল্টু হোসেন বলেন, “বেনাপোল ও মোংলা বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়| এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন|”
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা| কিন্তু ব্যয় বাড়লেও কাজের গতি বাড়েনি|
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জন পেম এবং অপারেশন ম্যানেজার গেইল মার্টিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কাজের ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন| গত ১৯ জুলাই ঝিনাইদহ সফরকালে তারা সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ডিসে¤^র ২০২৬-এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে| মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে|
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করা হবে| অন্যথায় ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ এবং জনদুর্ভোগ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়বে|