ভাগ্য বদলাতে রাশিয়া, এখন ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে ত্রিশালের শাহরিয়ার

কাজ করতে গিয়েছিলাম, যুদ্ধ করতে নয়—আমাদের দেশে ফিরিয়ে নিন

ময়মনসিংহ অফিস:

বৃদ্ধ মায়ের চোখে ঘুম নেই। ছেলের অপেক্ষায় কেটে যাচ্ছে একেকটি দিন। কখনো প্রতিবেশীদের কাছে ছেলের খবর জানতে ছুটে যাচ্ছেন, কখনো নামাজ শেষে হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে দোয়া করছেন। তার একটাই আকুতি—‘আমার আর কিছু লাগবে না, শুধু আমার ছেলেটারে আইনা দেন।’

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের উজান ভাটিপাড়া গ্রামের জোসনারা বেগমের এই আকুতি এখন পুরো পরিবারের কান্নার প্রতিচ্ছবি। তার ছেলে শাহরিয়ার সুমন (৩৮) ভাগ্য বদলের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে এখন ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবিরে আটক রয়েছেন বলে দাবি করেছে তার পরিবার।

যুদ্ধ করতে নয়, জীবিকার সন্ধানেই রাশিয়ায় গিয়েছিলেন শাহরিয়ার—এমনটাই বলছে তার পরিবার। কিন্তু ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া এই যুবকের জীবন এখন আটকে গেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতায়। পরিবারটির দাবি, প্রতারণার মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয় তাকে। পরে অল্প দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।

সম্প্রতি ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবির থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে শাহরিয়ারকে জীবিত অবস্থায় দেখা যাওয়ার পর নতুন করে আশার আলো দেখছে তার পরিবার। এখন তাদের একটাই দাবি—কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

শাহরিয়ার ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। সীমিত আয়ে দুই স্ত্রী, তিন সন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবার সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হতো। সংসারের অভাব, ঋণের চাপ এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ জুন বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় যান শাহরিয়ার। বিদেশ যেতে পরিবারের প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। এই অর্থের একটি বড় অংশ জোগাড় করতে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও এনজিও থেকেও ঋণ নেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যদের শাহরিয়ার বলেছিলেন, কয়েক বছর বিদেশে কাজ করতে পারলেই ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে। সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরবে, সন্তানদের ভবিষ্যৎও ভালো হবে। সেই আশাতেই সবকিছু বিক্রি ও ধারদেনা করে তাকে বিদেশে পাঠায় পরিবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে গভীর উৎকণ্ঠায়।

রাশিয়ায় গিয়ে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন শাহরিয়ার। পরিবারের দাবি, প্রায় ছয় মাস পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তখন দেশে ফেরার সুযোগ থাকলেও বিপুল ঋণের কারণে তিনি দেশে ফিরতে পারেননি।

পরিবারের ভাষ্য, মস্কোতে এক ব্যক্তি প্রথমে তাকে আঙুরবাগানে কাজ দেওয়ার কথা বলেন। পরে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। এ জন্য শাহরিয়ারের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

এ সময় রুশ ভাষায় লেখা কয়েকটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই কাগজগুলোতে কী লেখা ছিল, তা শাহরিয়ার বুঝতে পারেননি বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

পরবর্তীতে পরিবার জানতে পারে, ওই নথির মাধ্যমেই শাহরিয়ারকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

পরিবারের দাবি, যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে শাহরিয়ার সম্মতি দেননি। তারপরও নানা চাপের মুখে তাকে সামরিক প্রশিক্ষণে নেওয়া হয় এবং মাত্র কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

ইউক্রেনের বন্দিশিবির থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে শাহরিয়ার নিজের অবস্থার কথা জানিয়েছেন বলে পরিবার জানিয়েছে।

ভিডিওতে তিনি দাবি করেন,তাকে মাত্র তিন দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এরপরই তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হতো না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

একপর্যায়ে আরেক বাংলাদেশি নাগরিক কামরুল হাসানকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন শাহরিয়ার। পরে তারা ইউক্রেন সীমান্তে পৌঁছালে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে আটক হন বলে ভিডিও বার্তায় জানান তিনি।

বন্দিশিবির থেকে দেওয়া ওই ভিডিও বার্তায় শাহরিয়ার বাংলাদেশ সরকারের কাছে দ্রুত তাদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আকুতি জানান। সেখানে তারা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে রয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পরিবারের সদস্যদের কাছে এই ভিডিও যেন অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠার মতো। কারণ, এর আগে তারা বিশ্বাস করেছিলেন শাহরিয়ার আর বেঁচে নেই।

গত ২০ জুন স্বজনদের কাছে খবর আসে, ইউক্রেনে ড্রোন হামলায় শাহরিয়ার নিহত হয়েছেন। এমন খবরে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার।

বৃদ্ধ মা জোসনারা বেগম ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। বাবা ওয়াজেদ আলীও ছেলের মৃত্যুর খবর কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না।

কিন্তু কয়েক দিন আগে বন্দিশিবিরের ভিডিওতে শাহরিয়ারকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। এতে শোকের জায়গায় ফিরে আসে নতুন আশা।

তবে স্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে নতুন উদ্বেগ—শাহরিয়ার এখন কোথায়, তার অবস্থা কেমন এবং কীভাবে তাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে?

শাহরিয়ার রাশিয়ায় যাওয়ার পর তার দ্বিতীয় স্ত্রী খালেদা আক্তারের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে ইরফান আহমেদ। শিশুটির বয়স এখন নয় মাস।

খালেদা আক্তার বলেন, ‘শেষ ফোনে বলছিল, আমার জন্য দোয়া করো। যদি বেঁচে থাকি, আবার দেখা হবে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে শুনলাম মারা গেছে। এখন ভিডিওতে দেখলাম বেঁচে আছে। আমার স্বামী কাজ করতে গিয়েছিল, যুদ্ধ করতে নয়। আমি শুধু চাই, ও যেন দেশে ফিরে আসে।’

শিশু ইরফানের কাছে বাবা এখনো শুধুই একটি পরিচিত নাম। অথচ সেই বাবার ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে পুরো পরিবার।

মঙ্গলবার দুপুরে শাহরিয়ারের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা দেখা যায়। ছেলের প্রসঙ্গ উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা ওয়াজেদ আলী।

নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে ছেলের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বিদেশ পাঠানোর জন্য জমিজমা বিক্রি করছি। বড় ছেলেরাও ঋণ কইরা টাকা দিছে। ভাবছিলাম, বিদেশে গিয়া কামাই কইরা সংসারের অভাব দূর করবো। কিন্তু দালালের খপ্পরে পইড়া যুদ্ধে চলে গেছে। এই অবস্থা জানলে কোনো দিন বিদেশ যাইতে দিতাম না। সরকার আমার পোলাডারে দেশে ফিরাইয়া আনুক।’

বাবার এই আকুতির সঙ্গে যোগ হয়েছে মায়ের কান্না, স্ত্রীর অপেক্ষা এবং সন্তানের না-বোঝা অপেক্ষা।

শাহরিয়ারকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে লিখিত আবেদন করেছে তার পরিবার।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, শাহরিয়ার বর্তমানে ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে থাকলেও ভবিষ্যতে যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের আওতায় তাকে রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে—এমন তথ্য তারা পেয়েছেন। এ কারণে বিষয়টি আরও জটিল হওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শাহরিয়ারের ভগ্নিপতি আনোয়ার হুসাইন বলেন, দ্রুত সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ করে তার অবস্থান নিশ্চিত করা এবং নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পরিবারের আশঙ্কা, সময় যত গড়াবে, শাহরিয়ারকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও তত জটিল হতে পারে।

এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

পরিবারের প্রত্যাশা, স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে বিষয়টি দেখবে এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শাহরিয়ারকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে।

যে যুবকটি ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্নে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেই শাহরিয়ার এখন নিজেই বন্দি। মা অপেক্ষা করছেন ছেলের ফেরার পথের দিকে। বাবা তাকিয়ে আছেন সরকারের উদ্যোগের দিকে। স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর ফিরে আসার। আর নয় মাসের শিশু ইরফান অপেক্ষা করছে এমন একজন বাবার জন্য, যাকে সে জন্মের পর কখনো দেখেনি।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহরিয়ার বিদেশে গিয়েছিলেন কাজের সন্ধানে; যুদ্ধ করার জন্য নয়। দালালের প্রতারণা ও নানা পরিস্থিতির কারণে তিনি যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।

এখন তার পরিবারের কাছে অর্থ, সম্পদ কিংবা আর্থিক স্বচ্ছলতার কোনো দাবি নেই। তাদের একটাই চাওয়া—শাহরিয়ার যেন জীবিত ও নিরাপদে দেশে ফিরে আসেন।

বৃদ্ধ মা জোসনারা বেগমের কণ্ঠে তাই বারবার ফিরে আসে একই আকুতি—‘আমার আর কিছু লাগবে না, শুধু আমার ছেলেটারে আইনা দেন।’

এই আকুতির উত্তর এখন নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *