মায়ের সংগ্রাম, ভাইয়ের ত্যাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
মোঃ আবু সাইদ শওকত আলী , ঝিনাইদহ-
ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান পাড়ার মিশন আহাম্মেদের জীবন যেন সংগ্রামের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। ছোটবেলায় মাকে রেখে বাবা চলে যাওয়ার পর থেকেই ময়না বু’র জীবনে শুরু হয় সন্তানদের নিয়ে এক কঠিন লড়াই। অভাবের সংসারে বড় ভাই ভোলার ত্যাগ এবং মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে বড় হয়েছেন মিশন।
মিশনের বড় ভাই ভোলা নিজেও অর্থাভাবে লেখাপড়া বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি। বর্তমানে তিনি একটি বাস কাউন্টারে কাজ করেন। নিজের পড়াশোনা থেমে গেলেও ছোট ভাই মিশনের পড়াশোনায় কোনো ত্রুটি রাখেননি তিনি। দুই ভাইয়ের এই দীর্ঘ সংগ্রামের কথা শুনলে যে কারও চোখে পানি চলে আসবে—এমনটাই বলছেন তাদের পরিচিতজনেরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৩৫-৪০ বছর আগে ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান পাড়ার চার রাস্তার মোড়ের দক্ষিণ পাশে ফাঁকা জায়গায় মিশনের মা ময়না বু একটি একচালা ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে সেখানে কাপড়ের মার্কেট গড়ে উঠেছে। ওই ঘরের বারান্দায় একটি চৌকিতে মিশনকে থাকতে দেখেছেন এলাকার অনেকে।
মিশনের মা গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। সেই সামান্য আয় দিয়েই চলত সংসার এবং সন্তানদের লেখাপড়া। কীভাবে সেই সংসার চলেছে, তা সহজেই অনুমেয়।
ছোটবেলা থেকেই মিশন ছিলেন মেধাবী। অর্থের অভাবে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ না পেলেও বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর সরকারি চাকরির আশায় শুরু করেন নিরন্তর সংগ্রাম।
পরবর্তীতে ওই এলাকায় মার্কেট নির্মাণ হলে মিশনের পরিবারকে আগের বসতি ছেড়ে পাশেই ভাড়া বাসায় উঠতে হয়। পরিবারের দাবি, ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাসের বিষয়টি এর আগেও মিশনের সরকারি চাকরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণে এর আগে এসআই পদে চাকরির সুযোগও হারিয়েছেন মিশন।
এবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করে নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছিলেন তিনি। কিন্তু চাকরির প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত তার নাম না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছে পরিবারটি। মিশনের বয়সও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার শেষ পর্যায়ে বলে পরিবারের দাবি। ফলে এই সুযোগ হাতছাড়া হলে তার সরকারি চাকরির স্বপ্ন আর পূরণ নাও হতে পারে।
মিশনের পরিবারের দাবি, তার স্থায়ী ঠিকানা, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাসের বিষয়টি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
মিশনের বড় ভাই ভোলা বলেন, “মামা, মিশনের সরকারি চাকরিটা হচ্ছে না। অনেক জায়গায় ঘুরেছি। তাই এখন জেলা পরিষদের প্রশাসক মজিদ মামার কাছে এসেছি। মিশনদের সঙ্গে ১৮২ জন সরকারি প্রাথমিকের চাকরিতে সুপারিশ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮০ জন চাকরি পেয়েছে। দুজন বাদ পড়েছে—একজনের মামলা আছে, আর আমাদের বাড়ি নেই। এখন কী করব, ভেবে পাচ্ছি না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা অনেক কষ্ট করে মিশনকে পড়াশোনা করিয়েছি। মায়ের বয়স হয়েছে। এই চাকরিটা হলে আমাদের পরিবারের অনেকটা ভরসা হতো।”
মিশনের পরিবারের এই দাবি ও চাকরির ক্ষেত্রে ঠিক কী কারণে তার নাম বাদ পড়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। তবে একটি দরিদ্র পরিবারের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর শিক্ষিত হয়ে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের স্বপ্ন এভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় সহানুভূতি তৈরি হয়েছে।
পরিবারটির পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি মানবিক ও আইনানুগভাবে যাচাই করে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, মিশনের যোগ্যতা ও কাগজপত্র যাচাই করে যদি কোনো আইনগত বাধা না থাকে, তাহলে তার চাকরির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হবে।
মিশনের পরিবারের বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন এবং দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর পরিবারটির সামনে একটি নতুন আশার দরজা খুলবে।