ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে ৪৬ লাখ টাকা খরচ, লাটভিয়ার জঙ্গলে মিলল ঝিনাইদহের সোহেলের মরদেহ

আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ প্রতিনিধ

ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা দিয়েও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি ঝিনাইদহের সোহেল রানা (৪৫)। প্রায় দেড় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে ঘোরানোর পর তাঁকে লাটভিয়া ও বেলারুশ সীমান্তবর্তী একটি জঙ্গলে নির্যাতনের পর ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহতের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা।

নিহত সোহেল রানা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের আবুল হাশেমের ছেলে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ৭ অক্টোবর তাঁকে লাটভিয়ার লাতগালে অঞ্চলের দাওগাউপিলস এলাকার একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৮ অক্টোবর সেখানকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মামলার আসামিরা হলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের শামছুন্নাহার (৫৫), তাঁর স্বামী শাহাজান সরকার (৫৮), তাঁদের দুই ছেলে ইতালিপ্রবাসী সোহাগ (৩৫) ও কাতারপ্রবাসী নাসির সরকার (৩২), আবুল কালাম সরকারের ছেলে সোহেল রানা (৪১), শাহাজান সরকারের জামাতা আব্দুর রাজ্জাক (৫০), সোহাগ সরকারের স্ত্রী তন্নি সরকার (৩২), মিশরপ্রবাসী রিয়াদ দেওয়ান (৩৫) এবং শরিফুল সরকার (৪৮)।

২৬ লাখ টাকায় শুরু, পরে আরও টাকা আদায়ের অভিযোগ নিহত সোহেলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা জানান, বৈধ পথে ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রথমে তাঁর স্বামীর কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল সোহেলকে কাতারে পাঠানো হয়। ৯০ দিনের মধ্যে তাঁকে ইতালিতে নেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কাজের ব্যবস্থা করা হয়নি।

জেসমিনের অভিযোগ, পরে দেশে ফেরার জন্য সোহেলের কাছে টিকিট পাঠানো হলেও তাঁকে ফিরতে দেওয়া হয়নি। বরং মিসর হয়ে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে আসামিরা আরও পাঁচ লাখ টাকা নেন। ওই টাকা দেওয়ার পর ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট তাঁকে ইতালির পরিবর্তে মিসরে পাঠানো হয়।

তিনি আরও জানান, গত ২৫ আগস্ট সোহেল রানার ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৯ অক্টোবর আরও সাড়ে চার লাখ টাকা চাওয়া হয়। স্বামীর জীবন বাঁচানোর আশায় পরিবার বিভিন্ন সময়ে কয়েক কিস্তিতে টাকা পাঠায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা খরচ করেও তাঁকে দেশে কিংবা ইতালিতে ফেরানো সম্ভব হয়নি বলে পরিবারের দাবি।

জঙ্গল থেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে মৃত্যু
সোহেলের শ্যালক ইশতিয়াক আহমেদ জানান, বৈধ পথে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তাঁর ভগ্নিপতিকে প্রায় দেড় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, লাটভিয়া ও বেলারুশ সীমান্তবর্তী একটি জঙ্গলে সোহেলকে নির্যাতনের পর ফেলে রাখা হয়।

ইশতিয়াক বলেন, গত ১২ অক্টোবর লাটভিয়ার পুলিশ তাঁদের বার্তা পাঠিয়ে জানায়, ৭ অক্টোবর সোহেলকে জঙ্গল থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিন ৮ অক্টোবর তিনি মারা যান। পরে পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তাঁরা এ বিষয়ে জানতে পারেন। সোহেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।

এলাকার আরও অনেকে প্রতারণার শিকার
স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে এই চক্রটি রামচন্দ্রপুরসহ হলিধানী ইউনিয়নের অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। তাঁরা ইতালিতে যেতে না পেরে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে তিনি জানান।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এনামুল হক নিলু বলেন, রামচন্দ্রপুর গ্রামের সোহেল রানা লাটভিয়ার একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধারের পর সেখানকার হাসপাতালে মারা গেছেন বলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পেরেছেন। ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন জানান, এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর কিংবা বিদেশি কোনো দূতাবাস থেকে তাঁদের কাছে এখনো তথ্য আসেনি। খবর পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *