১৮ বছর চাকরি করেও বেতন নেই, দুই মেয়েকে নিয়ে ঋণের বোঝায় জর্জরিত চাঁদ আলী

সরকারি প্রকল্পে নিয়োগ, তবু মেলেনি বেতন-ভাতা; ধারদেনায় চলছে সংসার, অনিশ্চিত সন্তানদের ভবিষ্যৎ

আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ:
দুই মেয়ের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে প্রতিনিয়ত ধারদেনা করতে হচ্ছে চাঁদ আলী খানকে। সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন থাকলেও সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। ঋণের বোঝা বাড়ছে, বাড়ছে দুশ্চিন্তাও। অথচ সরকারি একটি প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করলেও বেতন-ভাতা না পাওয়ার অভিযোগ তার। জীবনের মূল্যবান সময় কর্মক্ষেত্রে ব্যয় করেও উপার্জনের নিশ্চয়তা না মেলায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার।

চাঁদ আলী খান ঝিনাইদহ শহরের ক্যাডেট কলেজ পাড়ার বাসিন্দা। তার অভিযোগ, ‘১০০টি নির্বাচিত মাদরাসায় দাখিল ভোকেশনাল কোর্স প্রবর্তন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োগ পেয়ে ২০০৮ সালে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বলরামপুর দাখিল মাদরাসায় যোগদান করেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও বেতন-ভাতার ব্যবস্থা হয়নি। ফলে দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে ধারদেনার ওপর।

চাঁদ আলী খান জানান, ২০০৪ সালের ৬ অক্টোবর এ নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে ২৮ ও ২৯ এপ্রিল ঢাকায় নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় নিয়োগ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০০৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নিয়োগের জন্য সুপারিশপত্র পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন।

তার ভাষ্য, প্রকল্পের আওতায় সরকারি অর্থায়নে ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে দায়িত্ব পালন করেও তিনি বেতনভুক্ত হতে পারেননি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি বিধি অনুযায়ী এমপিওভুক্তির মাধ্যমে বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ তার।

দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ায় সংসারের আর্থিক সংকট ক্রমেই গভীর হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া এবং পরিবারের অন্যান্য ব্যয় মেটাতে ঋণ করতে হয়েছে তাকে। একদিকে ধারদেনা পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার চিন্তা—সব মিলিয়ে দিশেহারা চাঁদ আলী। নিয়মিত আয় না থাকায় কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই দুশ্চিন্তাই এখন তার নিত্যসঙ্গী।

এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন তিনি। চাঁদ আলীর অভিযোগ, ব্যক্তিগতভাবে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেও বেতন-ভাতা পাওয়ার বিষয়ে কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি। দীর্ঘদিনের কর্মজীবন পার হলেও আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে তার।

চাঁদ আলী খান বলেন, “দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে চাকরি করেও বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে সংসারের খরচ চালাতে হচ্ছে। ঋণের বোঝা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু সেই ঋণ পরিশোধের কোনো উপায় নেই। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি। এত বছর দায়িত্ব পালন করেও যদি বেতন না পাই, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব?”

আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “সরকারের কাছে আমার দাবি, আমাদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা হোক। পরিবার নিয়ে যেন একটু স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারি, সেই সুযোগ করে দেওয়া হোক।”

দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ার এ অভিযোগের সুরাহা চান চাঁদ আলী খান। তার মতো প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের বেতন-ভাতা ও চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান তিনি। তার প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *