তিন লাখ টাকা ও এক টন চাল বরাদ্দ, শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন-তদন্তের দাবি স্থানীয়দের
জীবননগর অফিস:
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের যাদবপুর গ্রামে একটি মাদ্রাসার নামে সরকারি বরাদ্দ ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের অনুদান গ্রহণ এবং সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার নামে সহায়তা সংগ্রহ করা হলেও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত জমিতে মাদ্রাসার নামে দ্বিতল ভবন নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে ভবন নির্মাণে সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যাদবপুর দারুল উলুম ইসলামিয়া নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও লিল্লাহি বোর্ডিং নামে প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মাসুদুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদ থেকে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে
জীবননগর উপজেলা পরিষদ থেকে এক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সব মিলিয়ে নগদ অর্থ ও খাদ্যসহায়তার এই বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।
ব্যক্তিগত জমিতে ভবন, মালিকানা ও অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরে প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত জমিতে দ্বিতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে জমির মালিকানা, ভবনটি মাদ্রাসার প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে কি না এবং নির্মাণকাজে কোন উৎসের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
মাদ্রাসার নামে সরকারি অর্থ বা খাদ্যসহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হলে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দের আদেশ, অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের হিসাব, চাল গ্রহণ ও বিতরণের নথি এবং ভবন নির্মাণের অর্থের উৎস যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
তবে শুধু ব্যক্তিগত জমিতে ভবন নির্মাণের তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। জমির মালিকানা, প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা অনুমোদনের অবস্থা এবং বরাদ্দের শর্ত পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী ও পাঠদান নিয়ে স্থানীয়দের সংশয়
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, মাদ্রাসাটিতে নিয়মিত পাঠদান তাঁদের চোখে পড়ে না এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও তেমন দেখা যায় না। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটি, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার্থীদের তালিকা এবং শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে গ্রামের অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই বলেও তাঁরা অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে, মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাসুদুর রহমানের দাবি, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তিনি নিজেসহ দুজন শিক্ষক সেখানে পাঠদান করেন। ভবন নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় গত তিন মাস ধরে শিক্ষার্থীরা ছুটিতে রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে আবার পড়াশোনা শুরু হবে বলে তিনি জানান।
প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণ ভবন নির্মাণের কাজ। তবে প্রকৃতপক্ষে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছে, তাঁদের উপস্থিতির রেকর্ড কী, পাঠদান কোথায় ও কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি ছিল কি না—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ভর্তি রেজিস্টার, হাজিরা খাতা, শিক্ষকসংক্রান্ত নথি ও সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করা যেতে পারে।
জেলা পরিষদের বক্তব্য: তদন্ত করে দেখা হবে
মাদ্রাসার নামে বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র বলেন, “ব্যক্তি মালিকানাধীন মাদ্রাসায় সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব।”
তিনি জানান, সাধারণত জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয় ব্যক্তিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুদান দেওয়া হয়।
তাঁর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাদ্রাসাটির নামে তিন লাখ টাকা বরাদ্দের ক্ষেত্রে কী ধরনের আবেদন করা হয়েছিল, বরাদ্দের সুপারিশ ও অনুমোদন কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে এবং অর্থ ছাড়ের আগে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
এক টন চাল বরাদ্দের ব্যবহারও যাচাইয়ের দাবি
জীবননগর উপজেলা পরিষদ সূত্রে প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক টন চাল বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে চালটি বাস্তবে কে গ্রহণ করেছেন, কোন খাতে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থী বা উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি খাদ্যসহায়তা বরাদ্দের ক্ষেত্রে বরাদ্দপত্র, চাল উত্তোলনের চালান, গ্রহণের রসিদ এবং বিতরণসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হলে বরাদ্দের ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি জেলা পরিষদের তিন লাখ টাকার বরাদ্দের বিপরীতে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে কি না এবং অর্থ ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন সরেজমিনে মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পাঠদান, জমির মালিকানা, ভবন নির্মাণের অর্থের উৎস এবং সরকারি বরাদ্দের ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। একই সঙ্গে মাদ্রাসার নামে প্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদানের হিসাবও পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি। তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না মিললে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি বরাদ্দ ও অনুদান প্রদানের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। তাই যাদবপুর দারুল উলুম ইসলামিয়া নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও লিল্লাহি বোর্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বরাদ্দের অর্থ ও চালের যথাযথ ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিচালনাব্যবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।