বিএনপি নেত্রী খালার হয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিতে এসে ধরা পড়ল কলেজের ছাত্রী

আবু সাইদ শওকত আলী,বিশেষ প্রতিনিধি:-
বগুড়া জিলা স্কুল কেন্দ্রে গত ২৪ এপ্রিল শুক্রবার বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএসসি বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা চলছিল। দুপুর দুইটার দিকে ২০১ নম্বর কক্ষে কক্ষ পরিদর্শক উত্তরপত্রে সই নেওয়ার সময় দেখেন প্রবেশপত্রের ছবির সঙ্গে বেঞ্চে বসা পরীক্ষার্থীর চেহারা মিলছে না। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন ঈশিতা আক্তার তিশা। তার বয়স ১৮ এবং তিনি বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। অথচ পরীক্ষার রোল এবং প্রবেশপত্রটি ছিল বগুড়া শহর মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিপা খাতুনের নামে।

জিজ্ঞাসাবাদে ঈশিতা সরাসরি স্বীকার করেন যে নিপা খাতুন তার খালা। খালার অনুরোধেই তিনি তার হয়ে পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে এসেছিলেন। ঘটনার পরপরই কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ঈশিতাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। বর্তমানে ঈশিতা বগুড়া সদর থানা হেফাজতে আছেন। বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী জানিয়েছেন, পরীক্ষা কেন্দ্র বা বাউবি কর্তৃপক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলেই ঈশিতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনায় নিপা খাতুন জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, পরীক্ষার সময় তিনি জরুরি কাজে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সামান্য সময়ের জন্য ভাগনিকে কেন্দ্রে বসিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী মূল পরীক্ষা তিনিই দিচ্ছিলেন এবং পুরো বিষয়টি ভুল-বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। তবে কেন্দ্র সূত্রের তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। কক্ষ পরিদর্শক যখন ঈশিতাকে শনাক্ত করেন তখন উত্তরপত্রে লেখালেখি এবং সই দুটোই ঈশিতা করছিলেন। যদি মূল পরীক্ষার্থী নিপা খাতুন হন, তাহলে খাতার লেখা এবং সই তার হওয়ার কথা। পরীক্ষার মাঝে কিছু সময়ের জন্য বাইরে গেলে পুরো খাতার দায়িত্ব অন্যের হাতে চলে যায় না।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হলো আইন ও নিয়মের জায়গা। ধরে নিলাম নিপা খাতুনের কথাই সত্য এবং তিনি সত্যিই জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী কোনো পরীক্ষার্থী অসুস্থ হলে বা বাইরে যেতে হলে তাকে কক্ষ পরিদর্শককে জানাতে হয়। কেন্দ্র সচিবের অনুমতি নিয়ে খাতা জমা দিয়ে তারপর বের হতে হয়। প্রয়োজনে মেডিকেল টিমের সহায়তা নেওয়ার ব্যবস্থাও কেন্দ্রে থাকে। কিন্তু কোনোভাবেই নিজের নির্ধারিত সিটে অন্য একজনকে বসিয়ে রেখে যাওয়ার নিয়ম নেই। প্রবেশপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে যে পরীক্ষার্থী ছাড়া অন্য কেউ হলে প্রবেশ করতে পারবে না। তাই নিপা খাতুন যদি সত্যিই বাইরে গিয়ে থাকেন, তাহলে তার সিট খালি থাকার কথা। সেই খালি সিটে ভাগনিকে বসিয়ে রাখাটা নিজেই পরীক্ষা বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।

পাবলিক পরীক্ষা আইন, ১৯৮০ এর ৩ ধারা অনুযায়ী পরীক্ষায় অসদুপায় বলতে শুধু নকল করা বোঝায় না। অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়া, অন্যকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানো, ভুয়া পরীক্ষার্থী সেজে হলে ঢোকা, কেন্দ্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইনে সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান আছে। এর সঙ্গে পরীক্ষার্থীর ওই পরীক্ষা বাতিল হয় এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে। ফলে এই ঘটনায় শুধু নিপা খাতুন নন, ১৮ বছর বয়সী ঈশিতার পুরো শিক্ষাজীবনও এখন হুমকির মুখে।

এই ঘটনা নতুন নয়। প্রতি বছরই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে গিয়ে অনেকে ধরা পড়ে। কিন্তু এবারের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন রাজনৈতিক দলের পদধারী নেত্রী হওয়ায় বিষয়টি আলাদা মাত্রা পেয়েছে। সমাজ একজন জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে বাড়তি নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা আশা করে। সেখানে নিজের সার্টিফিকেটের জন্য ভাগনির ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে যায় না। একজন অভিভাবক হিসেবেও প্রশ্ন থেকে যায়, সামান্য সময়ের জন্য সিটে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটা কতটা দায়িত্বশীল ছিল। আজ ঈশিতার নামে মামলা হলে তার কলেজের রেকর্ডে দাগ পড়বে, ভবিষ্যতে চাকরি বা উচ্চশিক্ষায় জটিলতা তৈরি হবে।

এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল যে পরীক্ষার হলে সামান্য ছবি মেলানোর মাধ্যমেই জালিয়াতি ধরা পড়ে যায়। তাহলে যারা ধরা পড়ছে না তারা কীভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নও ওঠে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় অনেক মানুষের জন্য দ্বিতীয়বার পড়ালেখার সুযোগ তৈরি করে। সেই সুযোগের অপব্যবহার হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। পরীক্ষা শুধু পাস ফেলের বিষয় না। এটা রাষ্ট্রের দেওয়া একটি সনদ। সেই সনদে যখন জালিয়াতি ঢোকে, তখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

তদন্ত শেষে বোঝা যাবে নিপা খাতুন আসলেই হাসপাতালে ছিলেন নাকি পরিকল্পিতভাবেই ভাগনিকে পরীক্ষা দিতে পাঠিয়েছিলেন। তবে তার নিজের দেওয়া ব্যাখ্যা মানলেও কাজটা আইনসিদ্ধ হয় না। পরীক্ষার হলে আবেগ বা আত্মীয়তার জায়গা নেই। নিয়ম হলো, আপনি অসুস্থ হলে পরীক্ষা ছেড়ে দেবেন অথবা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

নিজের সিটে অন্য কাউকে বসানো মানে আপনি নিজেই পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার রাস্তা তৈরি করে দিলেন। এই কারণেই কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ঈশিতাকে ধরার পর সরাসরি পুলিশে দিয়েছে। কারণ ঘটনাটা শুধু ভুল বোঝাবুঝি না, এটা বিধি ভাঙার স্পষ্ট প্রমাণ। বগুড়ার এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিল, সার্টিফিকেটের চেয়ে নিয়ম মানা এবং অন্যের জীবন নষ্ট না করাটা অনেক বেশি জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *