৩০ হাজার মানুষের তবারকের আয়োজন, বাউল গান-মৃত্যুকূপ-নাগরদোলায় বাড়তি আকর্ষন।
জীবননগর অফিস:
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার বাঁকা ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে হযরত রাখাল শাহের মাজার প্রাঙ্গণে প্রতি বছর ১৫ ভাদ্র অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী রাখাল শাহের মেলা ও ওরশ। এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩৯তম আড়ম্বরপূর্ণ ওরশ ও মেলা। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সাধুসঙ্গ, জিকির-আজগার ও আধ্যাত্মিক সংগীতের পাশাপাশি লোকজ বিনোদনের নানা আয়োজনকে ঘিরে এ মেলা পরিণত হয়েছে এলাকার অন্যতম বড় মিলনমেলায়। এবারও ওরশ ও মেলাকে ঘিরে দূর-দূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত, অনুসারী ও দর্শনার্থীর সমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
হযরত রাখাল শাহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও মাজার জিয়ারতকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ১৫ ভাদ্র আলীপুর গ্রামের মাজার প্রাঙ্গণে ভক্তদের মিলন ঘটে। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মেলায় আসতে শুরু করেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাজার ও মেলা প্রাঙ্গণে মানুষের ভিড়ও বাড়তে থাকে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাধু-ভক্তদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
ওরশের মূল আয়োজনকে ঘিরে মাজার প্রাঙ্গণে সমবেত হন ভক্ত ও অনুসারীরা। জিকির-আজগার, ইবাদত, সাধুসঙ্গ এবং আধ্যাত্মিক গান-বাজনার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়। রাখাল শাহের স্মরণে ভক্তরা মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং নিজেদের মনোবাসনা পূরণের আশায় প্রার্থনা করেন। স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এ আয়োজন ধর্মীয় অনুভূতি ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

রাখাল শাহ দরবার কমিটির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, এবারের ওরশে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বড় পরিসরে তবারকের আয়োজন। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জন্য তবারক প্রস্তুত করা হবে। এ জন্য দুটি গরু জবাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে তবারক বিতরণের জন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। রান্না, পরিবেশন ও বিতরণ—সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে স্বেচ্ছাসেবকদেরও দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি রয়েছে।
ওরশ উদযাপন কমিটির অন্যতম সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, ওরশ ও মেলাটি ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতিরও একটি বড় মিলনক্ষেত্র। এবারের মেলায় থাকছে লোকজ সংস্কৃতির নানা আয়োজন। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ঢাকার নামকরা বাউল শিল্পীদের সমন্বয়ে বাউল সংগীত পরিবেশনের আয়োজন করা হয়েছে। বাউল শিল্পী মুন্নি সরকার ও তাঁর দল এবারের মেলায় আসছেন বলে তিনি জানান। তাঁদের পরিবেশনায় আধ্যাত্মিক ও লোকগানের সুরে মুখরিত হবে মেলা প্রাঙ্গণ।
বাউল গানের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য থাকছে নাগরদোলা ও মৃত্যুকূপের খেলা। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের কাছে এসব আয়োজন বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।
ওরশ ও মেলাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে আলীপুর গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে।বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্যও রাখা হয়েছে নানা আয়োজন।
প্রতি বছর ১৫ ভাদ্র অনুষ্ঠিত এ মেলা স্থানীয় মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের পুরোনো ঐতিহ্য। সময়ের সঙ্গে মেলার পরিসর ও মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সাধুসঙ্গের মূল আবহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। রাখাল শাহের মেলা ও ওরশকে ঘিরে প্রতি বছরই আলীপুর গ্রামে তৈরি হয় এক ভিন্ন পরিবেশ।

দরবার কমিটি ও ওরশ উদযাপন কমিটির সভাপতি মুন্সী আবুল কাশেমের প্রত্যাশা, সবার সহযোগিতায় এবারও শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে রাখাল শাহের মেলা ও ওরশ অনুষ্ঠিত হবে। বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে ১৫ ভাদ্র আলীপুর গ্রামের মাজার প্রাঙ্গণ ধর্মীয় আবহ ও লোকজ সংস্কৃতির এক বড় মিলনকেন্দ্রে পরিণত হবে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করবেন। মেলায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আয়োজকদের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। একই সঙ্গে ওরশ ও মেলা প্রাঙ্গণে মাদক সেবনসহ কোনো ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপের সুযোগ থাকবে না বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।