আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ:
“দেশের জন্য কিছু করব বলেই প্রবাস জীবনের প্রতিটি ডলার সঞ্চয় করেছি। সেই টাকায় গড়া স্বপ্ন আজ আমার চোখের সামনেই ভেঙে যাচ্ছে।”
কথাগুলো বলছিলেন ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়ার সন্তান ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ড. মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন। দীর্ঘদিন বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে তিনি ২০১৯ সালে ঝিনাইদহের লাউদিয়া মৌজায় একটি জমিসহ প্রতিষ্ঠিত মার্কেট ক্রয় করেন। পরে এর নাম দেন ‘আল-আজিম মার্কেট’। তাঁর স্বপ্ন ছিল এটিকে একটি আধুনিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
কিন্তু সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের নোটিশ পাওয়ার পর সেই স্বপ্নে নেমে আসে অনিশ্চয়তার ছায়া। অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর মার্কেটের ১১টি সচল দোকান একে একে বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকের চেম্বার, গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। বর্তমানে পুরো মার্কেটজুড়ে ঝুলছে তালা। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দোকানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক মানুষ, অনিশ্চয়তায় পড়েছে একাধিক পরিবারের জীবিকা।
ড. ফরহাদ হোসেন জানান, মার্কেটটি সম্প্রসারণের জন্য ইতোমধ্যেই নকশা প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং অনুমোদনের আবেদন করারও প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময়ই আসে ভূমি অধিগ্রহণের নোটিশ। তাঁর ভাষায়, “শুধু একটি ভবন নয়, আমার বহু বছরের পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন একসঙ্গে থেমে গেছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে এই ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে আমার মনে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করতে সবসময় প্রস্তুত। কিন্তু যদি বিনিয়োগের যথাযথ মূল্যায়ন ও ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে অনেকেই দেশে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও।”
তাঁর দাবি, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই উন্নয়ন যেন ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেই বাস্তবায়িত হয়। তিনি রাষ্ট্রের কাছে আইনের আলোকে ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়ন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের সাবেক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আহম্মেদ সায়াদাত বলেন, প্রবাসী ড. ফরহাদ হোসেনের আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, ভূমি অধিগ্রহণ আইন অনুসারেই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি জানান, গণপূর্ত বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট ছয়টি বিভাগের সরেজমিন প্রতিবেদন ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই জমি ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণকে ঘিরে এ ঘটনা একদিকে যেমন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে, অন্যদিকে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আস্থা, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।