কচুরিপানার দখলে ঝিনাইদহের ১২ নদ-নদী নাব্যতা হারাচ্ছে নদী, হুমকিতে মাছ ও জীববৈচিত্র্য; বাড়ছে জলাবদ্ধতা নেই অপসারণে সরকারি বরাদ্দ

আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ:
এক সময় ঝিনাইদহের নদ-নদীগুলো ছিল এই জনপদের প্রাণ। নবগঙ্গা, কুমার, ভৈরব, চিত্রা, কপোতাক্ষ, বেগবতীসহ নদীগুলোকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল কৃষি,মৎস্য, নৌবাণিজ্য ও জনজীবন। কিন্তু এখন সেই নদীগুলোর বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে কচুরিপানা। কোথাও কোথাও এতটাই ঘন স্তর তৈরি হয়েছে যে পানির অস্তিত্বই বোঝার উপায় নেই। ফলে ব্যাহত হচ্ছে পানিপ্রবাহ,দ্রুত কমছে নাব্যতা,সংকুচিত হচ্ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। বর্ষা মৌসুমে বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি। অথচ কচুরিপানা অপসারণে নেই কোনো সরকারি বরাদ্দ। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোও দায় এড়ানোর অভিযোগে একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৎস্য অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহের ১২টি নদ-নদীর প্রায় সবগুলোতেই এখন কমবেশি কচুরিপানার বিস্তার ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে নদী খনন, পরিষ্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা মাসের পর মাস নদীতে আটকে থাকায় নিচে পলি জমে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বিষয়খালী বাজারের চা ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, “এক সময় বেগবতী নদী দিয়ে সারাবছর নৌকা চলত। ব্যবসায়ীরা নৌপথে মালামাল আনতেন। এখন নদীজুড়ে শুধু কচুরিপানা। নৌ চলাচল অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।”

কালীগঞ্জ উপজেলার তেলকুপী গ্রামের বাসিন্দা রিপন হোসেন বলেন, “আগে নদীতে সারা বছর ডোঙা চলত। এখন কচুরিপানার কারণে অনেক সময় পানিই দেখা যায় না। বর্ষায় পানি নামতে দেরি হয়, আশপাশের ফসলি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।”

শৈলকুপার কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, নদীতে কচুরিপানা জমে থাকায় সেচের পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক খাল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজেও বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।

কচুরিপানার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। ভৈরব নদীর জেলে আব্দুস সামাদ বলেন, “আগে জাল ফেললেই বিভিন্ন জাতের মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছও কমে গেছে, জাল ফেলাও কঠিন। অনেক সময় জাল কচুরিপানায় আটকে ছিঁড়ে যায়।”

একই নদীর জেলে বিপুল হোসেন বলেন, “কচুরিপানার ঘন আস্তরণের কারণে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছায় না। এতে অক্সিজেন কমে যায়, মাছের প্রজনন ও বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।”

স্থানীয় পরিবেশবিদ ও পদ্মা সমাজকল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, “নদী একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা। কচুরিপানার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার শুধু নৌ চলাচল নয়, পুরো জলজ পরিবেশকে ধ্বংস করছে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে নদীগুলো পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হবে।”

তবে কচুরিপানা অপসারণে অর্থ সংকটের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, “পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, পলি জমা এবং উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু কচুরিপানা অপসারণের জন্য আমাদের কোনো বাজেট নেই। আমরা মূলত নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করি।”

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুন্তাসির রহমান বলেন, “কচুরিপানার কারণে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছাতে পারে না, দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায় এবং মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া কচুরিপানা পচে পানিদূষণ ও দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। তবে এ বিষয়ে আমাদের জন্যও নির্দিষ্ট কোনো সরকারি কর্মসূচি নেই।”

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অভিজিৎ শিল বলেন, “জেলার প্রায় সব নদীই কচুরিপানায় আক্রান্ত। এটি অপসারণ একটি বড় কর্মযজ্ঞ। কিন্তু সরকারের কোনো বরাদ্দ না থাকায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”

পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগে কচুরিপানা অপসারণ, নদী খনন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে ঝিনাইদহের নদীগুলোর অস্তিত্ব ও পরিবেশগত ভারসাম্য আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য এবং জনজীবনের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *