বিশেষ প্রতিনিধি:
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরে নানা ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ ও আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতীতে দল ও রাষ্ট্রের প্রতি অবদান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সরকার ও দলের সাংগঠনিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে আজ শনিবার বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষমতা দলের চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপরই ন্যস্ত করা হতে পারে। স্থায়ী কমিটির মতামত ও সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন
গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধানের সম্ভাব্য অষ্টাদশ সংশোধনীর বিষয়টি মাথায় রেখেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার চিন্তাভাবনা চলছে।
স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা, সিদ্ধান্ত পরে
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, আজকের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে মতামত গ্রহণের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যানের ওপর ন্যস্ত করা হতে পারে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, অতীতেও রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল।
কারা আলোচনায়
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির পরীক্ষিত, ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আলোচনায় যাদের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক।
এছাড়া বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও কিছু মহলে আলোচিত হচ্ছে।
দলের বাইরের সম্ভাব্য ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং জাতিসংঘে কর্মরত একজন জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি নারী কর্মকর্তার নামও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই মন্তব্য করেনি।
মির্জা ফখরুলকে নিয়ে আলোচনা বেশি
দলীয় সূত্র বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক সংকটে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা—এসব বিষয়কে তাঁর পক্ষে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ্যে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে মত দিয়েছেন।
তবে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হলে দলের মহাসচিব পদ শূন্য হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব এবং সংসদ সদস্য পদেও পরিবর্তন আনতে হবে। ফলে সরকার, দল ও সংসদ—তিন ক্ষেত্রেই পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে।
মোশাররফ হোসেনও শক্তিশালী আলোচনায়
রাষ্ট্রপতি পদে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিএনপির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনি। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
দলের একটি অংশের মতে, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য শক্তিশালী প্রার্থী করে তুলেছে। তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হলে মহাসচিব পরিবর্তন বা মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘চমক’ থাকতে পারে
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মতো এবারও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম গোপন রাখতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তবে এ বিষয়ে দলীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
কী বললেন মির্জা ফখরুল
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন—তিনি বিএনপির কেউ নাকি অন্য কোনো ব্যক্তি—সেটি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হবে। সংবিধান ও প্রয়োজনীয় আইন অনুসরণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
সংবিধান সংশোধনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি সূত্রগুলো জানায়, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল আনার প্রস্তুতি চলছে। সেখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, জুলাই জাতীয় সনদের বিভিন্ন সুপারিশ এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোতে কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব থাকতে পারে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সাংবিধানিক দায়িত্বে পরিবর্তন এলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মানদণ্ডও পরিবর্তিত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মত
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি শুধু দলীয় আনুগত্যের কারণে নয়, বরং সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জাতীয় গ্রহণযোগ্যতার কারণেও উপযুক্ত বিবেচিত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের আলোচনা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতির নাম জানতে এখন অপেক্ষা করতে হবে দলীয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণার।