ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:-
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ময়মনসিংহে শহীদ পরিবারের অনেকেই এখনো হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুত পুনর্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে ফেরা অনেক আহত ব্যক্তি এখনো নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে কেউ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, কেউ চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ফলে বিচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এই তিন দাবিই এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে শহীদ ও আহতদের পরিবারগুলোর কণ্ঠে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ময়মনসিংহে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন ছিল ১৯ ও ২০ জুলাই। কারফিউ উপেক্ষা করে রাজপথে নামা ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। তারা হলেন রিদোয়ান হোসেন সাগর (১৯), জোবায়ের হোসেন (১৮), বিপ্লব (১৮), নূরে আলম সিদ্দিকী রাকিব (১৯) ও সাইফুল ইসলাম (৩৮)। এছাড়া অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ জুলাই রাতে আনন্দ মোহন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী বৈঠক করে আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণ করেন। পরদিন টাউন হল মোড়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভের মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেন। ১৬ জুলাইয়ের পর আন্দোলন দ্রুত গণজোয়ারে রূপ নেয় এবং প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাজপথে অংশ নেন।
শহীদ রিদোয়ান হোসেন সাগরের বাবা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “আমি বাসায় ঢুকছিলাম, তখন সাগর বের হচ্ছিল। তাকে একটি কাজের কথা বলেছিলাম। সে বলেছিল, ‘আগামীকাল করে দেব।’ সেটিই ছিল আমার সঙ্গে ওর শেষ কথা।”
গৌরীপুরের শহীদ বিপ্লবের বাবা-মা বলেন, “আমাদের ছেলে যে বাংলাদেশ চেয়েছিল, সেই বাংলাদেশ এখনো আমরা পাইনি। আমরা শুধু হত্যার বিচার চাই।”
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরে আলম সিদ্দিকী রাকিব ২০ জুলাই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনতে কলতাপাড়া বাজারে গিয়েছিলেন। বাজারে সংঘর্ষের সময় মোবাইলে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস পর জন্ম নেয় সন্তান, যে আজও বাবার মুখ দেখেনি।
একই দিনে ফুলপুর উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলাম ধান বিক্রির পর ছোট মেয়ের জন্য আম কিনতে বাজারে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। বর্তমানে তাঁর স্ত্রী ও তিন সন্তান অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।
আহত জুলাই যোদ্ধা রোকনুজ্জামান রোকন বলেন, “২১ জুলাই রাতে ডিবি পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করতে এসে গুলি করে। এখনো পিঠের ক্ষতের যন্ত্রণা নিয়ে চলছি।”
আহত মনিরুজ্জামান মানিক বলেন, “যে চেতনা নিয়ে আমরা আন্দোলন করেছিলাম, সেই চেতনা বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।”
সরকার শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য আর্থিক সহায়তা, সম্মানী ভাতা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিলেও অনেক পরিবার বলছে, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। তাদের দাবি, সব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারি তালিকাভুক্ত করে কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে নিহতদের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা। তাদের ভাষ্য, বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে না।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য সরকারের ঘোষিত সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে। তবে মামলার অগ্রগতি ও পুনর্বাসনের সর্বশেষ তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে হালনাগাদ করা হচ্ছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে ময়মনসিংহের শহীদ ও আহতদের পরিবারের একটাই প্রত্যাশা—হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার, আহতদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করে তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।