জীবননগর ধোপাখালীতে তালাকের পরও রেহাই নেই তরুণার, হামলা-লুট ও চেক মামলার অভিযোগ

জীবননগরে সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে অসহায় নারীর পরিবারের অভিযোগ নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দাবি
জীবননগর অফিস:
দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে নির্যাতনের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে তালাক নিয়েছিলেন তরুণী তরুণা। কিন্তু সংসার ভেঙে আলাদা হওয়ার পরও যেন পিছু ছাড়ছে না সেই আতঙ্ক। সাবেক স্বামী ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে হামলা, আমবাগান কেটে ফেলা, ঘরে প্রবেশ করে নগদ টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়া এবং স্বাক্ষর করা চেক ব্যবহার করে মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আর্থিক সংকটে দিন কাটছে তরুণার বিধবা মায়ের পরিবারের।
ঘটনাগুলো চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের ধোপাখালি গ্রামের। ভুক্তভোগী তরুণার বাবা মৃত আব্দুল কালাম কালু। তার পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও তারা বিষয়গুলো মীমাংসার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তরুণাকে তালাক দিতে বাধ্য হন তারা। এরপরও একের পর এক ঘটনায় পরিবারটি আরও বিপাকে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০ থেকে ১১ বছর আগে একই গ্রামের জমশের আলীর ছেলে সোহেলের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তরুণার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তবে বিয়ের পর থেকেই তরুণার সঙ্গে সোহেল অমানবিক আচরণ ও নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ তার মায়ের। সন্তান জন্মের পরও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর নানা কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করার পর মেয়ের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে একপর্যায়ে তারা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন।
তরুণার মায়ের অভিযোগ, তালাকের পর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাদের প্রায় দেড় বিঘা জমির আমবাগান কেটে ফেলা হয়। পরিবারের দাবি, এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিষয়টি জানাজানি হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যান বলে অভিযোগ পরিবারের। পরে নিরাপত্তার আশঙ্কায় তারা নিজেদের বাড়িতে নিয়মিত অবস্থান না করে জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতে শুরু করেন।
পরিবারটির অভিযোগ, এই সুযোগে বাড়িটি অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। একপর্যায়ে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে নগদ ৭৫ হাজার টাকা, বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা শাড়ি, কাপড়, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়। একই সময় তরুণার বড় মেয়ের জামাইয়ের দুটি ব্যাংকের স্বাক্ষর করা চেকবইও নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার মা।
এ ঘটনায় তরুণার পরিবার চুয়াডাঙ্গা আদালতে লিখিত অভিযোগ করেছে বলে জানিয়েছে। পরে বিষয়টি মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে সালিশ-বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহেলের বড় ভাইসহ স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন এবং চেকবইসহ নেওয়া মালামাল ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে সোহেল আত্মগোপনে থাকায় শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি পরিবারের।
পরবর্তীতে ওই চেক ব্যবহার করে তরুণার বড় মেয়ের জামাইসহ দুজনের বিরুদ্ধে প্রায় ১৮ লাখ টাকার মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তরুণার মা। পরিবারের দাবি, তাদের অজান্তে নিয়ে যাওয়া স্বাক্ষর করা চেক ব্যবহার করে মামলা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মামলার নথি, চেকের ব্যবহার এবং অর্থ লেনদেনের প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে শুধু মামলা বা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগই নয়, তরুণার ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেছে পরিবার। তাদের ভাষ্য, একপর্যায়ে বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তরুণাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। হামলাকারী তাকে মৃত ভেবে চলে যায় বলেও পরিবারের দাবি। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসার সময় তার মাথায় ছয়টি সেলাই দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। এ ঘটনায় জীবননগর থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
তরুণার মা জানান, স্বামীকে হারানোর পর প্রায় ১১ বছর ধরে দুই মেয়েকে নিয়ে নানা কষ্টের মধ্যে সংসার চালিয়ে আসছেন তিনি। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মেয়েদের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ ও নির্যাতনের অভিযোগের কারণে শেষ পর্যন্ত মেয়ের বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয় তাকে। এখন বিচ্ছেদের পরও মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
তার ভাষ্য, একদিকে মেয়ের ওপর হামলার আতঙ্ক, অন্যদিকে ঘরের মালামাল ও অর্থ হারানোর অভিযোগ, পাশাপাশি চেক সংক্রান্ত মামলার চাপ—সবকিছু মিলিয়ে পরিবারটি মানসিক ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তরুণার মা বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর অনেক কষ্ট করে দুই মেয়েকে বড় করেছি। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্যও অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করার পর বাধ্য হয়ে তালাক দিতে হয়েছে। আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ চাই না, প্রতিশোধও চাই না। আমরা শুধু চাই, ঘটনাগুলো সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা হোক এবং সত্যটা বেরিয়ে আসুক। আমার মেয়ে ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।”
পরিবারটির দাবি, আমবাগান কেটে ফেলা, বাড়িতে প্রবেশ করে নগদ টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়া, চেকবই নেওয়া, চেক ব্যবহার করে মামলা এবং তরুণার ওপর হামলার অভিযোগ—প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আদালতে চলমান মামলা ও থানায় দেওয়া অভিযোগের বিষয়গুলো আইন অনুযায়ী যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে পরিবারটি।
তাদের আরও দাবি, কোনো পক্ষের বক্তব্য বা অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা না থাকলে নির্দোষদের হয়রানি থেকে রক্ষা করারও দাবি জানিয়েছে পরিবার।
তরুণার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা সংঘাত বা প্রতিশোধ চান না। দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের অবসান ঘটিয়ে নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান। এ জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তারা নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনি সহায়তা এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *