জীবননগরে চোরাকারবারের অভিযোগ ও সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামির সার ডিলারশিপ, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

জীবননগর অফিস:
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সাংবাদিক আবু সায়েম হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলাম শিবলু উপজেলার উথুলী ইউনিয়নে ২০২৬ সালের নতুন সার ডিলার হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চোরাকারবার ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের একাংশ।
জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত সার ডিলারের তালিকায় উথুলী ইউনিয়নের ‘সাদ এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম শিবলুর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো নিয়োগের আগে যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা ও অস্পষ্টতা দেখা গেছে।
চোরাকারবার ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ:
স্থানীয় সূত্রের দাবি,আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাইফুল ইসলাম শিবলু চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনার আলোচিত স্বর্ণ চোরাকারবারি তোতা-মান্নানের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। এ ছাড়া ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ফেনসিডিলসহ ডিবি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সাইফুল ইসলাম শিবলুর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক আবু সায়েম হত্যা মামলায় তাঁর বর্তমান আইনি অবস্থান সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষোভ:
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীও প্রশ্ন তুলেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তাঁদের প্রশ্ন, কোন মানদণ্ডে সাইফুল ইসলাম শিবলুকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের একাংশের দাবি, সাংবাদিক হত্যা মামলায় অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির সার ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি জনস্বার্থে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, নিয়োগের আগে মামলা, অভিযোগ ও নির্ধারিত যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:
জীবননগর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও জীবননগর প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সদস্য আতিয়ার রহমান বলেন, “সরকারের ঘোষণা ছিল, অভিযোগ রয়েছে—এমন কোনো ব্যক্তি সার ডিলারশিপ পাবেন না। একজন চোরাকারবারি ও সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামি কীভাবে সার ডিলার হলেন, সেটি বড় প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন,“আমার কাছে মনে হচ্ছে, কালো টাকার প্রভাব ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। এত অভিযোগ থাকার পরও কীভাবে তিনি ডিলারশিপ পেলেন, তা তদন্ত করা উচিত।”
সাইফুল ইসলাম শিবলুর ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জীবননগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান খোকন বলেন, “এ ব্যাপারে বলার কিছু নেই। উপজেলা কৃষি অফিসের তদন্ত কমিটির দেওয়া তালিকা জেলা বিএনপির সুপারিশে তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন।”
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা: (ইউএনও) সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি বলেন, “উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কমিটির সদস্যসচিব। বিষয়টি তিনিই পরিষ্কার করে বলতে পারবেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে এ তালিকা দেওয়া হয়নি; উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেলায় পাঠানো হয়েছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, “সাইফুল ইসলামের নামে যে মামলার কথা বলছেন, সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই। সার ডিলারশিপের আবেদনের নির্ধারিত শর্তগুলো তিনি পূরণ করায় তাঁর নাম তালিকায় ছিল। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি যাচাই করে তালিকা দেয়। পরে আমরা তা জেলায় পাঠিয়েছি।”
জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ বলেন, সাইফুল ইসলামের নামে মামলা আছে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়নি।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন নাহার বলেন, “ডিলারশিপের জন্য একটি কমিটি ছিল। সাইফুল ইসলাম যে চোরাকারবারি ও হত্যা মামলার আসামি, বিষয়টি কমিটির সভায় উপস্থাপন হয়েছিল বলে আমার মনে পড়ে না। আপনি বিষয়টি জানিয়েছেন, আমরা দেখব।”
তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তির আগে অভিযোগগুলো যাচাই করা হয়েছিল কি না,জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,২০২৬ সালের নতুন সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উপজেলা কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনজনের নাম জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে সুপারিশ করা হয়। পরে তালিকাটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়।
তবে জীবননগরের উথলী ইউনিয়নে সাইফুল ইসলাম শিবলুর ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে বিতর্কের পর নিয়োগের যোগ্যতা যাচাই, তদন্ত কমিটির কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো বিবেচনায় নেয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি,নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা নিরপেক্ষ ভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সার ডিলার নিয়োগের নির্ধারিত শর্ত, তদন্ত কমিটির যাচাই প্রতিবেদন এবং অনুমোদনের নথি পর্যালোচনা করে বিষয়টি পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *