অবকাঠামোর মাঝে সবুজ করিডোর-সৌন্দর্য স্বস্তি ও পরিবেশের সমন্বিত বার্তা
ময়মনসিংহ অফিস::
একসময় ধুলা, ধোঁয়া ও দীর্ঘ যানজটের কারণে ক্লান্তিকর পথ হিসেবে পরিচিত ছিল দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। রাজধানী থেকে উত্তরাঞ্চলমুখী এই গুরুত্বপূর্ণ করিডর এখন বদলে গেছে দৃশ্যমান নান্দনিকতায়। সড়কের মাঝখানের মিডিয়ানজুড়ে সারিবদ্ধভাবে ফুটে থাকা গোলাপি ফুল, পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা শোভা বর্ধনকারী বৃক্ষ এবং পরিকল্পিত সবুজায়ন পথচারী ও যাত্রীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
ঢাকা ছাড়িয়ে গাজীপুর, ভালুকা ও ত্রিশাল অতিক্রম করে ময়মনসিংহ অভিমুখে এগোতেই চোখে পড়ে দীর্ঘ সবুজ বেষ্টনী। বসন্তের সময়ে একযোগে ফুল ফোটায় সড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে রঙিন আবহ। সকালের কুয়াশা কিংবা বিকেলের সোনালি আলো—দুই সময়েই ফুলে মোড়া অংশগুলো আলাদা মাত্রা যোগ করছে। ভারী যানবাহনের ব্যস্ত চলাচলের মাঝেও প্রকৃতির এই উপস্থিতি দৃশ্যত আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের সৌন্দর্যায়ন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে কয়েক বছর আগে মিডিয়ান ও সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির শোভা বর্ধনকারী ও ছায়াদানকারী গাছ রোপণ করা হয়। নিয়মিত ছাঁটাই, সেচ ও পরিচর্যার ফলে গাছগুলো এখন পরিণত আকার পেয়েছে।
সওজ ময়মনসিংহের এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন,
“মহাসড়ক শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি। পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা পরিবেশ সংরক্ষণ ও নান্দনিক পরিবেশ—দুই লক্ষ্যই সামনে রেখেছি। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মিডিয়ানে রোপিত গাছগুলো এমনভাবে নির্বাচন করা হয়েছে যাতে শিকড় সড়কের কাঠামোর ক্ষতি না করে এবং দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত না হয়।
পরিবেশবিদদের মতে, মহাসড়কের দুই পাশে ও মিডিয়ানে গাছের সারি থাকলে তা-বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক,বিশেষত ধুলাবালি ও কার্বন শোষণে কার্যকর,শব্দদূষণ আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে,তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে,জীববৈচিত্র্যের ক্ষুদ্র আবাসস্থল তৈরি করে।দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সবুজায়ন টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একজন স্থানীয় পরিবেশকর্মী বলেন,
“অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। এই উদ্যোগ অন্য মহাসড়কের জন্যও দৃষ্টান্ত হতে পারে।”ঢাকা থেকে শেরপুরগামী এক যাত্রী জানান,“দীর্ঘ পথযাত্রা অনেক সময় একঘেয়ে হয়ে যায়। কিন্তু এখন এই মহাসড়কে উঠলেই ভিন্ন এক অনুভূতি হয়। চোখে শান্তি লাগে।”ত্রিশাল এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন,“অনেকে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার ইতিবাচক প্রচারও হচ্ছে।”
স্থানীয়দের মতে, ধারাবাহিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে মহাসড়ককে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত সবুজ করিডর গড়ে উঠতে পারে, যা আঞ্চলিক পর্যটনের সম্ভাবনাও তৈরি করবে।
তবে সব অংশে সমানভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু এলাকায় গাছের ডাল ভাঙা, অবৈধভাবে পোস্টার টাঙানো এবং ময়লা ফেলার ঘটনা দেখা গেছে। সচেতন নাগরিকরা নিয়মিত নজরদারি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

সওজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে-ক্ষতিগ্রস্ত গাছ পুনরায় রোপণ করা হবে,নিয়মিত পরিচর্যা জোরদার করা হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই করিডর এখন শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর রাস্তা নয়; পথ নিজেই হয়ে উঠেছে দর্শনীয়। বসন্তের গোলাপি ছোঁয়ায় সেজে ওঠা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রমাণ করছে—পরিকল্পিত উদ্যোগ থাকলে উন্নয়ন ও নান্দনিকতা পাশাপাশি চলতে পারে। যথাযথ পরিচর্যা ও নাগরিক সচেতনতা অব্যাহত থাকলে এই মহাসড়ক ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম সবুজ ও দৃষ্টিনন্দন সড়কপথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।