ঋণের বোঝা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের
আবু সাইদ শওকত আলী ,ঝিনাইদহ:
ঈদের আগে খামারজুড়ে ছিল ব্যস্ততা,চোখে ছিল স্বপ্ন। বছরের পর বছর কষ্ট করে লালন-পালন করা গরু বিক্রি করে ঋণ শোধ করবেন,সংসারের অভাব দূর করবেন-এমন প্রত্যাশা নিয়েই ঝিনাইদহের শত শত খামারি ছুটেছিলেন রাজধানীর পশুর হাটে। কিন্তু ঈদ শেষ হওয়ার পর সেই স্বপ্নের জায়গা দখল করেছে হতাশা,লোকসান আর অনিশ্চয়তা। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে অবিক্রিত গরু নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে অনেককে। আর ফিরেই পড়েছেন নতুন বিপদে। ঢাকা থেকে ফেরত আনা অনেক গরুর মধ্যে খুরা রোগ,মুখে ঘা,জ্বর ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ফলে একদিকে আর্থিক ক্ষতি,অন্যদিকে রোগাক্রান্ত পশুর চিকিৎসা ও খাদ্য ব্যয়-দুই সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার প্রান্তিক খামারিরা।
ঈদকে ঘিরে যে স্বপ্ন নিয়ে খামারিরা সারা বছর পরিশ্রম করেন,এবার সেই স্বপ্নের বড় অংশই ভেঙে গেছে। লোকসানের হিসাব মেলাতে না মেলাতেই দেখা দিয়েছে রোগের আতঙ্ক। ঋণের কিস্তি,পশুর চিকিৎসা,খাদ্য ব্যয়,রোগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-সব মিলিয়ে ঝিনাইদহের খামারি পরিবারগুলোর মধ্যে এখন উৎসব-পরবর্তী আনন্দের বদলে বিরাজ করছে গভীর উদ্বেগ। যে গরুগুলোকে ঘিরে তারা লাভের স্বপ্ন দেখেছিলেন,আজ সেই গরুগুলোই হয়ে উঠেছে তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,চলতি বছর ঝিনাইদহে কোরবানির জন্য মোট ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৯৭টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর মধ্যে জেলার চাহিদা ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪২০টি। ফলে উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ৯৭৭টি। এসব পশুর বড় একটি অংশ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু আবার খামারে ফিরে এসেছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের পর খামারগুলোতে উদ্বেগের পরিবেশ বিরাজ করছে। অবিক্রিত গরুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় খামারিদের প্রতিদিন অতিরিক্ত খাদ্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই আতঙ্কিত।
কয়েকজন খামারি জানান,ঢাকা থেকে ফেরার তিন-চার দিনের মধ্যেই গরুর মুখে ঘা,জ্বর,খাবারে অনীহা এবং খুরে ক্ষতের মতো উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করেছে।
খামারিরা বলছেন,দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আনা হাজার হাজার পশুর সঙ্গে একই হাটে অবস্থান করার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ট্রাকে যাতায়াত,প্রচণ্ড গরম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবেও পশুগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এদিকে গো-খাদ্যের বাজারও খামারিদের জন্য নতুন মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে। ভুসি,খৈল,খড় ও ঘাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অবিক্রিত গরুগুলো খামারে রেখে পালন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন অতিরিক্ত খাদ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক খামারি নতুন করে ঋণ করার কথাও ভাবছেন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাদপুকুরিয়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তা আম্বিয়া খাতুন লাকী এবার কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ৩৪টি গরু প্রস্তুত করেছিলেন। খামার সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংক ঋণ,এনজিওর ঋণ এবং ব্যক্তিগত সঞ্চয় মিলিয়ে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। ঈদের কয়েকদিন আগে গরুগুলো নিয়ে যান ঢাকার একটি বড় পশুর হাটে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন,বাজারের চিত্র তার প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আম্বিয়া খাতুন লাকী বলেন,’প্রতিটি গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। খাবার,ওষুধ,পরিচর্যা-সব মিলিয়ে যে হিসাব ছিল,সেই অনুযায়ী দাম পেলে কিছু লাভ হতো। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে দেখি ক্রেতা কম,আর যারা আসছে তারা উৎপাদন খরচের কাছাকাছিও দাম বলছে না। শেষ পর্যন্ত ২২টি গরু বিক্রি করেছি, তাতেও প্রায় চার লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। ১২টি গরু ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। এখন কয়েকটির মুখে ঘা ও খুরে সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাতে ঘুমাতে পারি না। একদিকে লোকসান,অন্যদিকে রোগ-কীভাবে সামাল দেব বুঝতে পারছি না।’
তিনি বলেন,’আমার মতো অনেক নারী খামারি আছেন,যারা সংসারের হাল ধরতে খামার করেছেন। কিন্তু এবার ঈদের পর আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় আছি।’
শৈলকুপা উপজেলার খামারি আব্দুল মালেক প্রায় ১৫ বছর ধরে গবাদিপশু পালন করেন। এবার তিনি ১৮টি গরু নিয়ে ঢাকার হাটে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিন দিন অবস্থান করেও আশানুরূপ বিক্রি করতে পারেননি। তিনি বলেন,’ট্রাক ভাড়া দিয়ে গরু ঢাকায় নিয়ে গেলাম। হাটে থাকার জন্য শ্রমিক রাখতে হয়েছে,খাবার কিনতে হয়েছে। কয়েকদিন পরে যখন বুঝলাম ভালো দাম পাওয়া যাবে না,তখন আবার ট্রাক ভাড়া করে গরু ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। এখন যে গরুগুলো ফিরিয়ে এনেছি,তার মধ্যে কয়েকটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে,খুঁড়িয়ে হাঁটছে। ডাক্তার বলছেন খুরা রোগের লক্ষণ। মনে হচ্ছে লোকসানের ওপর আবার নতুন খরচ চাপছে।’
হরিণাকুণ্ডু উপজেলার খামারি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন,’ঈদের আগে সবাই বলছিল এবার গরুর বাজার ভালো হবে। সেই আশা নিয়ে ধার-দেনা করে খামারে টাকা ঢেলেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সব হিসাব ভুল ছিল। কয়েকটা গরু বিক্রি হয়েছে,কিন্তু লাভ তো দূরের কথা,মূলধনও ওঠেনি। যেগুলো ফিরিয়ে এনেছি সেগুলো অসুস্থ। চিকিৎসা,খাবার-সবকিছুর খরচ বাড়ছে। আমরা এখন খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি।’
শৈলকুপার খামারি আবু তালেবের অভিযোগ,রাজধানীর হাটে দালালদের দৌরাত্ম্য এখনও কমেনি। তিনি বলেন,’ক্রেতারা সরাসরি দাম বলতে পারে না। দালালরা মাঝখানে এসে দাম কমিয়ে দেয়। আমরা যে দাম চাই,তার চেয়ে অনেক কমে বিক্রি করতে বাধ্য হই। এবার হাটে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট খামারিরা।’
মহেশপুর উপজেলার রফিকুল ইসলাম বলেন,’ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। ভেবেছিলাম ঈদের পর টাকা শোধ করে দেব। এখন সেই টাকাই শোধ করতে পারছি না। গরু বিক্রি হয়নি,আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সামনে কিস্তির সময়। কীভাবে দেব,সেটাই বুঝতে পারছি না। পরিবার নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.এ.এস.এম. আতিকুজ্জামান বলেন,’ঈদের হাটে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং দূরপাল্লার পরিবহনের কারণে পশুগুলো শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় খুরা রোগ,নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একই স্থানে বিভিন্ন এলাকার পশু একত্রিত হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। আক্রান্ত পশুকে দ্রুত আলাদা রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন,জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’