চার প্রকল্পে ১০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা হরিলুট!

ঝিনাইদহে কাবিখার টাকায় চেয়ারম্যানের 
পকেট ভারী নীরব প্রশাসন

আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নে গ্রামীণ পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মসূচির টাকা নিয়ে নজিরবিহীন লুটপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ইউনিয়নের চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দুটিতে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে এবং বাকি দুটিতে কোনো কাজই না করে পুরো ১০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান কাজী নাজির উদ্দীনের বিরুদ্ধে। এর আগে প্রতিবন্ধী স্কুল নির্মাণের নামে সরকারি অর্থ গায়েবের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এবার ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নয়ছয় করার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাধুহাটী ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামের মোমিনদের বাড়ি থেকে মোস্তপুর শ্মশানঘাট পর্যন্ত মাটি দ্বারা রাস্তা সংস্কার কাজের বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ টাকা। কিন্তু কাজ যতটুকু করা হয়েছে, তা উপকারের চেয়ে ভোগান্তিই বাড়িয়েছে বেশি। স্থানীয় বাসিন্দা ফজলুর রহমান ও আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাস্তার যে বেহাল দশা ছিল, তা বিন্দুমাত্র সমাধান হয়নি। লোকদেখানো কিছু মাটি ছিটিয়ে আগের মতোই দুর্ভোগে ফেলে পুরো ৩ লাখ টাকাই নিজের পকেটে পুরেছেন চেয়ারম্যান নাজির।”

একই চিত্র দেখা গেছে সাধুহাটী পূর্বপাড়া ঈদগাহ মাঠে। মাঠ সংস্কারে বরাদ্দ থাকলেও এখনো বড় বড় খাদ রয়ে গেছে বলে জানান স্থানীয় গ্রামবাসী ইমদাদুল হক মিলন ও চাঁদ আলী। তাঁদের ভাষ্য, “মাঠ সমান করতে অন্তত আরও ১০০ গাড়ি মাটি দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কোনো কাজ না করেই ভূয়া ভাউচারে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।”

সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে বংকিরা দাসপাড়ার এলজিইডি রাস্তা থেকে তেলবাটি মাঠ অভিমুখে রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে। ৫ লাখ টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মাটি ফেলে বাকি পুরো অর্থ গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উক্ত রাস্তায় কাজ করা দিনমজুর আব্দুল মালেক বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান, “আমরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক মিলে সর্বমোট ১৫ দিন কাজ করেছি। শ্রমিকের মজুরিসহ এখানে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার টাকার কাজ হতে পারে। বাকি চার লাখেরও বেশি টাকা কোথায় গেল?” বংকিরা গ্রামের বাসিন্দা রবিন ও নজরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবন্ধী স্কুলের নাম ভাঙিয়ে লাখ লাখ টাকা গায়েব করার পর এখন কাবিখার টাকায় হাত দেওয়া হয়েছে। এভাবে সরকারি টাকা লুটপাট করা চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হোসনে আরা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নাসরিন সুলতানা যোগসাজশে ও পরিদর্শনের তোয়াক্কা না করে বিল পাস করায় গোটা উপজেলায় এই হরিলুট সহজ হয়েছে।

সরেজমিন তদারকি ছাড়া কীভাবে বিল পাস হলো জানতে চাইলে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাবেক নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হোসনে আরা নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি পিআইওর জমাদানকৃত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বিলে স্বাক্ষর করেছি। সরেজমিনে গিয়ে কোনো কাজ পরিদর্শন করার সুযোগ আমার হয়নি।”

সাধুহাটীর চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী নাজির উদ্দীন জানান, মাটির কাজ ঠিকমতোই হয়েছে। কাজের মেয়াদ বেশি দিন হয়ে গেছে তাই এমনটি দেখা যাচ্ছে বলে তিনি দাবী করেন।

এদিকে সরেজমিনে পরিদর্শনের ফাইল আটকে না রেখে কেবল টেবিল-রিপোর্টের ভিত্তিতে লাখ লাখ টাকার ফাইনাল বিল ছাড় দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সুশীল সমাজে। জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি টাকা পকেটস্থ করা ইউপি চেয়ারম্যান কাজী নাজির উদ্দীন এবং তাঁর সহযোগী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *