মানবপাচার মামলায় ফাইনাল রিপোর্টে বাদী-সাক্ষীর স্বাক্ষর জালের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহনের দাবি

আবু সাইদ শওকত আলী,ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহের হরিণাকু-ু থানায় দায়ের হওয়া দুটি মানবপাচার মামলায় তদন্তকারী এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, বাদী ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর জাল এবং আদালতে মিথ্যা চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিলের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীরা পুলিশ সুপার, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন। কম্বোডিয়ার ক্যাসিনোতে মানব পাচারের শিকার দুই প্রবাসীর মামলায় খোদ তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চরম জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগকারী দুই ভুক্তভোগী হলেন হরিণাকু-ু উপজেলার ফলসি গ্রামের মোশাররফ হোসেনের ছেলে মো. হাবিবুল্লাহ বাশার এবং একই গ্রামের চাঁদ আলীর ছেলে রাশেদুল ইসলাম।

অভিযোগে বলা হয়, তাদের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা নিয়ে কুম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে একটি কথিত ‘চাইনিজ ব্ল্যাক ক্যাসিনো’ প্রতিষ্ঠানে জিম্মি করে নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। পাচারকারী চক্রের সদস্য কুলবাড়িয়া গ্রামের শরিফুল জোয়ারদার ও তার স্ত্রী জলি বেগম ও ছেলে সাজিদ জোয়ারদার। সেখানে জিম্মি রেখে নির্যাতনের পর তাদের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে দেশে ফিরে তারা মানবপাচার দমন ট্রাইব্যুনালে পৃথক দুটি পিটিশন মামলা (নং-৩৪/২০২৬ ও ৩৫/২০২৬) দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে গত ৬ মে হরিণাকু-ু থানায় নিয়মিত দুটি মামলা (নং-০৭/২৬ ও ১১/২৬) রুজু হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. নাহিদুর রহমান সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। এ দাবির সমর্থনে তাদের কাছে একটি অডিও রেকর্ড রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে আসামিদের সঙ্গে আপসের জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে বাদীরা এই অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গত ৩০ জুন আদালতে একটি মিথ্যা ও বানোয়াট চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। ওই প্রতিবেদন দাখিলের পরদিনই মামলার আসামিরা জামিন পান।

অভিযোগে আরও বলা হয়, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই বিমানে পাশাপাশি আসনে দেশে ফেরার পরও ভুক্তভোগীদের আসন নম্বর ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তদন্তের ফলাফল জানিয়ে বাদীর কাছে দেওয়া নথিতে বাদী রাশেদুল ইসলাম এবং সাক্ষী হাফিজ, মিন্টু ও মিল্টনের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাক্ষী মিল্টনের পিতার নামও ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী দুই প্রবাসি একই বিমানে পাশাপাশি সিটে দেশে ফিরলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃত ভাবে হাবিবুল বাসারের সিট নং বিএস-৩২৬ ও রাশেদুল ইসলামের সিট নয় বিএস-৩৪৬ নং উল্লেখ করেন।

এছাড়া গত ৩০ জুন মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করার সময় মামলার তদন্ত ফলাফল জানিয়ে বাদীকে যে পত্র দেওয়া হয় সেখানে বাদী রাশেদুলের এবং সাক্ষি হাফিজ, মিন্টু ও মিল্টনের সাক্ষর জাল করা হয়। সাক্ষি মিল্টনের পিতা ওয়াজ্জেদ আলী হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃত ভাবে পিতার নাম ইবাদত মন্ডল লেখা হয়।

ভুক্তভোগী হাবিবুল্লাহ বাশার ও রাশেদুল ইসলাম বলেন, তারা অভিযুক্ত কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মামলাগুলোর নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. নাহিদুর রহমান বলেন, মানবপাচারের অভিযোগ প্রমাণের জন্য অর্থ লেনদেনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র বাদীপক্ষ দিতে পারেনি। তিনি আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে আসামি গ্রেপ্তারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দাবি সংক্রান্ত একটি কলরেকর্ডের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান বলেন, লিখিত অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “পুলিশ বিভাগে কোনো দুর্নীতিবাজ বা দুষ্ট ব্যক্তির স্থান নেই। ব্যক্তির দায় পুলিশ বিভাগ বহন করবে না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *