জীবননগর অফিস:
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলীতে গরু বিক্রয়ের টাকা আদায় করা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে একই পরিবারের আপন দু’ভাইকে ফাঁকা মাঠে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় অপর ভাই মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছেন।
তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। হামলাকারীরা স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত এবং নিহতরা আওয়ামী সমর্থক। শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার উথলী গ্রামের ৭২ নম্বর ব্রিজের নিকট ওরশতলা মাঠে এ ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ
সামসুল হক নামের এক ব্যক্তিকে থানা হেফাজতে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি। ঘটনার পর পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলাসহ জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দেন।
প্রতিপক্ষের হামলায় নিহতরা হলেন-উথলী গ্রামের বড় মসজিদপাড়ার মৃত খোদা বকস ওরফে খুদে মন্ডলের ছেলে আনোয়ার হোসেন মিন্টা (৬০) ও তার ছোট ভাই হামজা আলী(৪৫) এবং এসময় গুরুতর আহত তাদের আরেক ভাই আব্দুর রাজ্জাক। আব্দুর রাজ্জাক বর্তমানে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য মতে কয়েক মাস আগে গরু ক্রয়-বিক্রয়কে কেন্দ্র করে উথলী গ্রামের মৃত আমোদ আলীর ছেলে নিজামউদ্দিন খোকা ও তার ছেলে জুয়েলসহ আত্মীয়-স্বজনদের সাথে প্রতিবেশী মিন্টা এবং তার ভাইদের মারামারির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় খোকা ও তার ছেলে জুয়েলকে কুপিয়ে জখম করে
প্রতিপক্ষ মিন্টারা। ভাগ্যক্রমে খোকা বেঁচে গেলেও দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকায় আর্থিক ভাবে চরম
ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে জুয়েলদের হামলায় মিন্টার ভাই হামজাকেও পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। সেই ঘটনায় উভয়পক্ষই থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা করেন। মামলাটি দু’টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। তবে উভয়পক্ষের মধ্যে চলতে থাকে শত্রুতা।
এদিকে শনিবার সকাল ৮ টার দিকে উথলী ওরশতলা মাঠে মিন্টা, হামজা ও রাজ্জাক তিন ভাই কৃষিকাজ করছিলেন। ওই সময় যুবদল ও বিএনপি-সমর্থিত স্থানীয় ৮-১০ জনের একটি সংঘবদ্ধ সশস্ত্র অবস্থায় তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র,দা, হাসুয়া ও লোহার রড দিয়ে তিন ভাইকে এলোপাতাড়ি মারপিট ও কোপাতে থাকে। এতে ঘটনাস্থলেই মিন্টা ও হামজা গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন এবং রাজ্জাকও মারাত্মক ভাবে আহত হন।
পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেয়ার আগেই হামজা আলী পথিমধ্যে মারা যান। মিন্টাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হলেও সকাল ১১ টার দিকে মারা যান। আহত রাজ্জাককে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতদের পরিবারের দাবি, গরু কেনাবেচা নিয়ে চার মাস আগে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। এরপর থেকে উভয় পরিবারের মধ্যে একাধিক বার উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় ভাবে কয়েক দফা সালিস বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি,বরং পরস্পরের বিরুদ্ধে জীবননগর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
স্বজনরা আরও জানান, কয়েক মাস আগে একই পক্ষ তাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তখন যশোর থেকে চিকিৎসা নিয়ে তারা বাড়ি ফিরেছিলেন। আজকের হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত বলেও দাবি করেন তারা।
নিহতদের দুলাভাই ইসলাম অভিযোগ করে বলেন,স্থানীয় নিজাম,বিপুল,স্বপন,তোতা,জুয়েল, হিমেল,সাইফুলসহ ৮-১০ জনের একটি দল এ হামলা চালিয়েছে। এদের মধ্যে স্বপন স্থানীয় ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি।
নিহতদের পরিবার দাবি করেছেন,গরু-বিক্রিয়ের ঘটনায় আদালতে চলমান মামলাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তারা আওয়ামী লীগ-সমর্থক ছিলেন, আর প্রতিপক্ষ বিএনপি-যুবদলের
রাজনীতির সা যুক্ত। পরিবারের ভাষায়,আওয়ামী লীগকে সমর্থন করাই তাদের অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং রাজনৈতিক ভাবে শক্তি পাওয়ার কারণেই এ হামলার ঘটনা ঘটাতে প্রতিপক্ষরা সাহস দেখিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা.ওয়াহিদ আহমেদ রবিন জানান,শনিবর সকাল ১০টার দিকে হামজাকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। মিন্টাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হলেও কিছুক্ষণ পর তিনিও মারা যান।
উথলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল হক ঝন্টু মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,ঘটনাটি দু:খজনক এবং মর্মান্তিক। উভয়পক্ষের মধ্যে গরু কেনাবেচার টাকা নিয়া সৃষ্ট বিরোধের জের
ধরে ইতিপু্র্বে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় এ হামলায় হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে গেল। পরিস্থিতি বর্তমানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পুলিশ সামসুল নামের এক ব্যক্তিকে থানা নিয়ে গেছে বলে জানি।
জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মামুন হোসেন বিশ্বাস বলেন,খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
যে,পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে। ঘটনার ব্যাপারে নিহতের পরিবার থেকে এখনও পর্যন্ত কোন লিখিত পাওয়া যায়নি।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর উথলী গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রভাব ও দীর্ঘদিনের পারিবারিক
শত্রুতা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। পুলিশ বলছে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।